দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি এখন এক উদ্বেগের বিষয়। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট বিভাগের এক গবেষণায় উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। গবেষকরা বিলের কই, বাটা, মেনি, গুলশা টেংরা ও পুঁটি মাছের অন্ত্র ও মাংসপেশিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন। এই পাঁচ ধরনের দেশি মাছের মধ্যে কই মাছে সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। শুধু মাছ নয়, দেশের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের তেল, দুধ ও চিনির মধ্যেও এর উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছে।
সাধারণত বোতলজাত পানি, লবণ, সামুদ্রিক খাবার এবং কিছু ফল ও সবজিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকে। এই পরিস্থিতিতে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, রান্না করলে কি এই ক্ষতিকর কণাগুলো নষ্ট হয়ে যায়?
বিজ্ঞান বলছে, সাধারণ রান্নার প্রক্রিয়ায় মাইক্রোপ্লাস্টিক পুরোপুরি নষ্ট হয় না। তবে প্রস্তুত প্রণালীর ওপর ভিত্তি করে এর পরিমাণ কিছুটা কমতে পারে। মূলত ৫ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণাকেই মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। বড় প্লাস্টিক ভেঙে বা শিল্পজাত পণ্যের মাধ্যমে এগুলো বাতাস, পানি ও মাটির সাহায্যে খাদ্যচক্রে প্রবেশ করে।
বেশিরভাগ মাইক্রোপ্লাস্টিক সাধারণ রান্নার তাপমাত্রায় গলে যায় না। কারণ অনেক প্লাস্টিকের গলনাঙ্ক ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের চেয়ে অনেক বেশি। ফলে ভাত, তরকারি বা মাছ রান্নার সময় যে তাপমাত্রা তৈরি হয়, তা এই কণাগুলোকে ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট নয়। তাই রান্না করলেই মাইক্রোপ্লাস্টিক দূর হয়ে যাবে—এমন ধারণা সঠিক নয়।
তবে কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ পদ্ধতি কার্যকর হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, শক্ত বা হার্ড পানি ফুটিয়ে পরে ছেঁকে নিলে কিছু মাইক্রোপ্লাস্টিক কমানো সম্ভব, কারণ ফুটানোর সময় খনিজ পদার্থের সঙ্গে আটকে অনেক কণা তলানিতে জমে যায়। তবে এটি সব ধরনের পানি বা প্লাস্টিকের ক্ষেত্রে সমান কার্যকর নয়, তাই একে সম্পূর্ণ সমাধান বলা যাবে না।
মাছ বা মাংস রান্নার মাধ্যমে মাইক্রোপ্লাস্টিক নষ্ট হয় এমন কোনো প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তবে সামুদ্রিক প্রাণীর অন্ত্রে বেশি প্লাস্টিক জমা থাকে বলে মাছ পরিষ্কারের সময় অন্ত্র ও অপ্রয়োজনীয় অংশ ফেলে দিলে ঝুঁকি কিছুটা কমানো সম্ভব। সবজির ক্ষেত্রেও বাইরের ধুলাবালি ও দূষণ ধুয়ে ফেলা গেলেও, উদ্ভিদের ভেতরে প্রবেশ করা ক্ষুদ্র কণাগুলো শুধু ধোয়ার মাধ্যমে দূর করা সম্ভব হয় না।
মানুষের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিকের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখনও গবেষণা করছেন। কিছু গবেষণায় ধারণা করা হয়েছে যে, এটি প্রদাহ, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস বা শরীরের নির্দিষ্ট কিছু কোষের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তবে ঠিক কতটা ক্ষতি হয় এবং ঝুঁকির মাত্রা কতটুকু, সে বিষয়ে এখনও নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও (WHO) জানিয়েছে, এ বিষয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
মাইক্রোপ্লাস্টিকের সংস্পর্শ কমাতে বিশেষজ্ঞরা কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। যেমন—প্লাস্টিকের বদলে কাচ বা স্টেইনলেস স্টিলের পাত্র ব্যবহার করা, গরম খাবার প্লাস্টিকের পাত্রে দীর্ঘক্ষণ না রাখা এবং প্লাস্টিকের পাত্রে খাবার গরম না করা। এছাড়া ফল ও সবজি ভালোভাবে ধুয়ে নেওয়া, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বর্জন করা এবং নিরাপদ পানির উৎসের পাশাপাশি উপযুক্ত ফিল্টার ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পরিশেষে, সাধারণ রান্নার তাপমাত্রা মাইক্রোপ্লাস্টিক ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট নয়। তবে সচেতন খাদ্যাভ্যাস, প্লাস্টিকের ব্যবহার হ্রাস এবং সঠিক পরিষ্কার পদ্ধতির মাধ্যমে এর সংস্পর্শ কমানো সম্ভব। এ বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার অরগানাইজেশন এবং এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির তথ্যের ভিত্তিতে গবেষণা এখনও চলমান।