ফাউন্ড্রি কারখানার স্ল্যাগকে পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করে বগুড়ায় তৈরি হচ্ছে ব্লক, ইউনি ব্লক ও সলিড ব্রিকস—যা নির্মাণ কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।
বগুড়া দেশের হালকা প্রকৌশল শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। কয়েক দশক ধরে এখানকার ঢালাইশিল্প (ফাউন্ড্রি) কারখানাগুলো কৃষিযন্ত্র, সেচপাম্প, মোটরযানের যন্ত্রাংশসহ নানা ধরনের শিল্পযন্ত্র তৈরি করে দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রেখে আসছে। এসব কারখানায় স্ল্যাগ বা শিল্পবর্জ্য তৈরি হয় এবং বছরের পর বছর তা কারখানার আঙিনায় জমে থাকতে দেখা যেত। এখন সেই জমে থাকা বর্জ্যই নতুন উদ্যোগের সম্ভাবনার ভিত্তি হয়ে উঠছে।
ফাউন্ড্রির এই বর্জ্যকে পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করে বগুড়ার একটি কারখানায় পরিবেশবান্ধব হলো ব্লক, ইউনি ব্লক ও সলিড ব্রিকস তৈরি করা হচ্ছে। বগুড়া নগরের দ্বিতীয় বাইপাস সড়কে সাবগ্রাম-কুরশাপাড়া এলাকায় জেড এইচ স্টার ব্লকস অ্যান্ড ব্রিকস লিমিটেড নামের কারখানাটিতে প্রতি মাসে প্রায় আড়াই লাখ হলো ব্লক, ইউনি ব্লক ও সলিড ব্রিকস তৈরি হয়। এসব পণ্য ব্যবহার হচ্ছে সরকারি-বেসরকারি অবকাঠামো উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজে।
বিশ্বব্যাংক ও পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) যৌথ অর্থায়নে সাসটেইনেবল মাইক্রোএন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড রেজিলিয়েন্ট ট্রান্সফরমেশন (স্মার্ট) নামের একটি প্রকল্পের আওতায় গ্রাম উন্নয়ন কর্ম (গাক) এ উদ্যোগে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে।
গত মঙ্গলবার জেড এইচ স্টার ব্লকস অ্যান্ড ব্রিকস লিমিটেড পরিদর্শনে দেখা যায়, সেখানে ঢালাই কারখানার স্ল্যাগ গুঁড়া করে স্তূপ করে রাখা হয়েছে। পাশাপাশি পাথরের গুঁড়া ও বালুর স্তূপ রয়েছে। কারখানায় সিমেন্টের বস্তাও সাজিয়ে রাখা দেখা যায়।
কারখানার কর্তৃপক্ষ জানান, ২০২০ সালে এখানে ব্রিকস উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হয়। শুরু থেকেই সলিড ব্রিকস, ইউনি ব্লক, হলো ব্লক ও রেজিং ব্লক উৎপাদন হচ্ছে। ইউনি ব্লক, হলো ব্লক ও সলিড ব্রিকস তৈরিতে এতদিন সিমেন্ট, বালু ও পাথরের কুচি ব্যবহার করা হতো এবং পাথর বিদেশ থেকে আনতে হতো। এক ঘনফুট পাথর কুচির দাম ছিল ১৪০ টাকা। ২০২৩ সালে বেসরকারি সংস্থা গাকের কর্মকর্তারা প্রথমে পাথর কুচির পরিবর্তে ঢালাই কারখানার স্ল্যাগ ব্যবহারের ধারণা দেন। পরে স্থানীয় একটি ঢালাই কারখানা থেকে স্ল্যাগ সংগ্রহ করে পাথর কুচির বদলে তা ব্যবহার করে পরীক্ষামূলকভাবে ইউনি ব্রিকস তৈরি করা হয়। এটির গুণগত মান পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয় হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউটে (এইচবিআরআই)। প্রতিষ্ঠানটি মান সনদে স্ল্যাগ দিয়ে তৈরি ইউনি ব্লকের শক্তিমাত্রা ২ হাজার ১০৫ পিএসআই উল্লেখ করা হয়।
জেডএইচ স্টার ব্রিকস অ্যান্ড ব্লকস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাখলিমুর রহমান বলেন, ‘পরীক্ষায় ভালো ফলাফল পাওয়ায় ফাউন্ড্রি কারখানার স্ল্যাগ ব্যবহার করে এখানে বাণিজ্যিকভাবে ইউনি ব্লক, হলো ব্লক ও সলিড ব্রিকস উৎপাদন শুরু হয়।’ তিনি আরও বলেন, শুরুতে বগুড়ার বিভিন্ন ফাউন্ড্রি কারখানা থেকেই বিনা মূল্যে স্ল্যাগ সংগ্রহ করতেন। এগুলো গুঁড়া করার জন্য পিকেএসএফ থেকে ক্রাশার যন্ত্রও সরবরাহ করা হয়েছে। শুরুতে বিনা মূল্যে মিললেও পরে ফাউন্ড্রি মালিকেরা স্ল্যাগ বিক্রি শুরু করেন। খরচ–সাশ্রয়ী হওয়ায় এখন নারায়ণগঞ্জের পাগলা থেকে গুঁড়া করা স্ল্যাগ সংগ্রহ করা হচ্ছে। কারখানা পর্যন্ত আনতে প্রতি কেজি স্ল্যাগে খরচ পড়ছে দুই টাকা। প্রতি বর্গফুট স্ল্যাগে গড়ে ৩০টি ইউনি ব্লক তৈরি করা যায়।
কারখানা সূত্র জানায়, কারখানা থেকে প্রতিটি সাদা রঙের ইউনি ব্লক ১৮, লাল রঙের ইউনি ব্লক ২০ টাকা, হলো ব্লক ৫০ ও সলিড ব্রিকস ১৩ টাকায় বিক্রি হয়। এ ছাড়া প্রতিটি হলো ব্লক ৫০, রেজিং ব্লক প্রতিটি ১৯০ টাকা দরে বিক্রি হয়।
তাখলিমুর রহমান বলেন, ফাউন্ড্রি স্ল্যাগ পুনর্ব্যবহার করে নির্মাণসামগ্রী উৎপাদন করায় পরিবেশ যেমন রক্ষা হচ্ছে, তেমনি কারখানায় উৎপাদন খরচও অনেক কমেছে।
বগুড়ার একেকটি ঢালাই কারখানায় প্রতিদিন প্রায় ২০০ কেজি বর্জ্য তৈরি হয়। বগুড়া ফাউন্ড্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি আজিজার রহমান বলেন, এই স্ল্যাগ অপসারণে প্রচুর অর্থ ব্যয় হতো। এখন স্ল্যাগই শিল্পের কাঁচামাল। ফলে একদিকে পরিবেশ রক্ষা হচ্ছে, অন্যদিকে নতুন অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি হচ্ছে। শিল্পের ভাষায় এটি ওয়েস্ট টু ওয়েলথ—বর্জ্য থেকে সম্পদ।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) বগুড়া জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান বলেন, ফাউন্ড্রি কারখানার স্ল্যাগ পরিবেশ দূষণ করে। এই শিল্পবর্জ্য কারখানার কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে, এটা অবশ্যই পরিবেশের জন্য ইতিবাচক এবং ভালো খবর।
পিকেএসএফের স্মার্ট প্রকল্পের প্রোগ্রাম ম্যানেজার (কমিউনিকেশন অ্যান্ড নলেজ ম্যানেজমেন্ট) আলাল আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশের ক্ষুদ্র উদ্যোগ খাত দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকা শক্তি। তবে উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় অদক্ষ সম্পদ ব্যবহার, অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা ও কর্মপরিবেশগত ঝুঁকি এ খাতের টেকসই উন্নয়নের পথে বড় চ্যালেঞ্জ। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পিকেএসএফ স্মার্ট প্রকল্প নিয়েছে।’ তিনি জানান, দেশের ৫৪টি জেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। তিনি আরও জানান, সরকারের সহায়তায় এবং বিশ্বব্যাংক ও পিকেএসএসএফের যৌথ অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পের আওতায় দেশের কৃষি, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং সেবা খাতের ৮০ হাজার উদ্যোক্তাকে বিভিন্ন আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা প্রদানের লক্ষ্য রয়েছে।