জোসনারা বেগম বারবার আঁচল দিয়ে চোখ মুছছিলেন। তিনি বলেন, ‘অভাবের কারণে বিদেশে গেছিল। দালালের হাতে পইড়া আইজ আমার ছেলের এই দশা। আমার আর কিছু লাগবে না, শুধু আমার ছেলেটারে আইনা দেন।’ তিনি জানান, তাঁর ছেলে শাহরিয়ার সুমন (৩৮) ইউক্রেনের বন্দিশিবিরে আটক রয়েছেন। তাঁদের বাড়ি ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার ধানীখোলা ইউনিয়নের উজান ভাটিপাড়া গ্রামে।

গত শনিবার দুপুরে জোসনারা বেগমের সঙ্গে কথা হয়। কিছুক্ষণ পর বাড়ির পাশের মসজিদ থেকে নামাজ পড়ে ফেরেন শাহরিয়ারের বাবা ওয়াজেদ আলী। ছেলের প্রসঙ্গ তুলতেই তিনি কাঁদতে শুরু করেন। ওয়াজেদ আলী বলেন, ‘বিদেশ পাডানির লাইগা জমিন বেচছি। বড় ছেরাও ঋণমিন কইরা টেহা দিছে। ভাবছিলাম, পোলা বিদেশে গিয়া কামকাজ কইরা টেহাপয়সা কামাইব, সংসারের অভাব দূর হইব। কিন্তু রাশিয়া যাওনের পরে ইতালি নিব কইয়া দালালেরা যুদ্ধে পাডাইছে। এই অবস্থা অইব জানালে কুনো দিন বিদেশ যাইতে দিতাম না। অহন একটাই চাওয়া—সরকার যোগাযোগ কইরা আমার পোলাডারে বাঁচাইয়া দেশে আইনা দিক।’

কয়েক সপ্তাহ আগেও এই দম্পতি ধরে নিয়েছিলেন তাঁদের ছেলে আর বেঁচে নেই। গত ২০ জুন স্বজনদের কাছ থেকে তাঁরা শুনেছিলেন, ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন হামলায় শাহরিয়ার সুমন নিহত হয়েছেন। ওই শোক কাটতে না কাটতেই কয়েক দিন আগে ইউক্রেনের একটি কারাগার থেকে প্রকাশিত ভিডিওতে ছেলেকে জীবিত দেখতে পান। এরপর থেকেই তাঁদের প্রার্থনা—শাহরিয়ার যেন জীবিত দেশে ফিরতে পারেন।

জানা যায়, শাহরিয়ার সুমন ঢাকায় একটি পোশাক প্রতিষ্ঠানে দর্জির কাটিং মাস্টার হিসেবে কাজ করতেন। আয় দিয়ে কোনোভাবে সংসার চললেও অভাব কাটছিল না। দুই স্ত্রী, তিন সন্তান এবং বৃদ্ধ মা-বাবার দায়িত্ব ছিল তাঁর কাঁধে। পরিবার জানায়, গত বছরের ৫ জুন বৈধ ওয়ার্ক পারমিট ভিসায় তিনি রাশিয়ায় যান। বিদেশে পাঠাতে প্রায় সাড়ে ১০ লাখ টাকা খরচ হয়। ওই টাকা জোগাড় করতে জমি বিক্রি করতে হয় এবং ব্যাংক ও এনজিও থেকে ঋণ নিতে হয়েছে। বিদেশ যাওয়ার আগে তিনি বলেছিলেন, কয়েক বছর কষ্ট করলে ঋণ শোধ হবে, সন্তানদের ভালোভাবে মানুষ করা যাবে এবং সংসারের কষ্ট কমবে। গত ২৪ এপ্রিল পরিবারের সঙ্গে তাঁর সর্বশেষ কথা হয়; এরপর আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

রাশিয়ায় গিয়ে শাহরিয়ার একটি নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করেন। বাংলাদেশে থাকতেই তিন মাস প্রশিক্ষণ শেষে তিনি সেখানে যান। তবে ছয় মাসের মাথায় প্রতিষ্ঠানটির কাজ বন্ধ হয়ে যায়। কোম্পানি দেশে ফেরার টিকিট দিলেও ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে তিনি ফিরতে চাননি বলে পরিবার উল্লেখ করে। তখনই নতুন করে দুর্ভাগ্য শুরু হয়।

পরিবারের ভাষ্য, মস্কোতে এক দালাল প্রথমে আঙুরবাগানে কাজ দেওয়ার কথা বলে তাঁকে নিয়ে যান। পরে ইতালিতে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে শাহরিয়ার ও তাঁর এক বাংলাদেশি সঙ্গীর কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা নেওয়া হয়। এরপর রুশ ভাষায় লেখা কিছু কাগজে স্বাক্ষর করানো হয় বলে তাঁরা জানান; ওই কাগজগুলোর অর্থ তাঁরা বুঝতে পারেননি। পরে তাঁদের জানা যায়, তাঁদের রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পরিবার দাবি করছে, শাহরিয়ার যুদ্ধ করতে অনিচ্ছুক ছিলেন। তবে নানা চাপের মুখে তাঁকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এবং পরে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়।

ইউক্রেনের কারাগার থেকে প্রকাশিত ভিডিওতে শাহরিয়ার নিজের মুখেই ঘটনার বর্ণনা দেন। তিনি জানান, মাত্র তিন দিনের সামরিক প্রশিক্ষণের পর তাঁদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। সেখানে ঠিকমতো খাবার দেওয়া হতো না বলে তিনি উল্লেখ করেন। কয়েক দিন পর আরেকটি অভিযানে পাঠানোর কথা থাকলেও তিনি এবং তাঁর বাংলাদেশি বন্ধু কামরুল হাসান পালিয়ে ইউক্রেনের দিকে চলে যান। সীমান্ত পার হওয়ার পরই তাঁরা ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর হাতে আটক হন এবং এরপর থেকে তাঁরা ইউক্রেনের একটি কারাগারে বন্দী আছেন।

ভিডিও বার্তায় শাহরিয়ারের কণ্ঠে ছিল একটাই আকুতি—‘বাংলাদেশ সরকারের কাছে আমাদের একটাই অনুরোধ—আমাদের দ্রুত উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে নেওয়া হোক। আমরা খুবই দুর্বিষহ অবস্থার মধ্যে দিন কাটাচ্ছি।’

শাহরিয়ার রাশিয়ায় যাওয়ার পর তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী খালেদা আক্তারের কোলে আসে ছেলে ইরফান আহমেদ। তার বয়স এখন ৯ মাস। তিনি জানিয়েছেন, ছেলেটি কখনোই বাবাকে দেখেনি। খালেদা আক্তার বলেন, ‘শেষবার ফোনে বলছিল, “আমার জন্য দোয়া করো। যদি বাইচ্চা থাকি, তোমাদের সঙ্গে দেখা হইবো।” এরপর আর কথা হয়নি। পরে শুনলাম, সে মারা গেছে। কয়েক দিন আগে ভিডিওতে দেখলাম, সে বেঁচে আছে। আমার স্বামী কাজ করতে গিয়েছিল, যুদ্ধ করতে নয়। দালালেরা প্রতারণা করে এই অবস্থায় ফেলেছে। আমি শুধু চাই, সরকার ওকে ফিরিয়ে আনুক। আমার সন্তান আজও তার বাবাকে দেখেনি।’

শাহরিয়ারের পরিবার ইতিমধ্যে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডে লিখিত আবেদন করেছে। তাঁর ভগ্নিপতি আনোয়ার হুসাইন বলেন, ইউক্রেনের কারাগার থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী যুদ্ধবন্দী বিনিময়ের মাধ্যমে শাহরিয়ারকে আবার রাশিয়ার হাতে তুলে দেওয়া হতে পারে। তাই দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া জরুরি বলে তিনি জানান। লিখিত আবেদন করলেও সরকারি পর্যায় থেকে এখনো তাঁরা কোনো আশ্বাস পাননি বলেও পরিবার উল্লেখ করেছে।

এ বিষয়ে লিখিতভাবে জানানো হলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানান ত্রিশাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরাফাত সিদ্দিকী।