বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি—তিন পার্বত্য জেলার বাজার ফান্ডের আওতাধীন এলাকায় বসবাসকারী হাজারো ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ গত প্রায় সাত বছর ধরে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ঋণসুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন। এর ফলে নতুন ব্যবসা শুরু, বিদ্যমান ব্যবসার সম্প্রসারণ, আবাসন নির্মাণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বড় ধরনের স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বাজার ফান্ডের জমির বিপরীতে ঋণ সুবিধা বন্ধ হওয়ার পর থেকেই পার্বত্য অঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী, ১৯০০ সালের হিল ট্র্যাক্টস ম্যানুয়ালের আওতায় পার্বত্য চট্টগ্রামে ‘বাজার ফান্ড’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। বাজার ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার লক্ষ্যেই এর সূচনা। শুরুতে চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার এই ফান্ডের দায়িত্বে থাকলেও পরবর্তীতে বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলা প্রতিষ্ঠার পর সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকরা দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৯ সালে পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠনের পর এই প্রশাসনিক দায়িত্ব জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

স্থানীয়দের দাবি, বাজার ফান্ড প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ১৭টি ব্যাংক এই ফান্ডের আওতাধীন জমিতে নির্মিত দোকানঘর, মার্কেট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও আবাসিক ভবনের বিপরীতে নিয়মিত ঋণ প্রদান করত। এই ঋণের সুযোগে হাজারো ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ পেয়েছিলেন এবং অনেক নতুন উদ্যোক্তার জন্ম হয়েছিল।

তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালে খাগড়াছড়ির তৎকালীন জেলা প্রশাসক প্রতাপ চন্দ্র বিশ্বাসসহ তিন পার্বত্য জেলার জেলা প্রশাসকরা পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকে একটি চিঠি পাঠানোর পর ঋণ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে বাজার ফান্ডের আওতাধীন জমি বন্ধক রেখে কোনো রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক আর ঋণ দিচ্ছে না।

আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় বাজার ফান্ড প্রশাসক ও তিন জেলার প্রশাসকদের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছিল। সেখানে বাজার ফান্ডের আওতাধীন রেকর্ডভুক্ত জমিতে প্রতিষ্ঠিত দোকান বা প্লট বন্ধক রেখে ব্যাংক ঋণ গ্রহণ এবং বন্ধকি দলিল জেলা রেজিস্ট্রেশন কর্মকর্তার মাধ্যমে নিবন্ধনের বিষয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে সেই উদ্যোগের কোনো বাস্তব প্রতিফলন ঘটেনি।

বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ব্যবসায়ী আব্দুল মান্নান বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন ধরে বাজার ফান্ডের আওতাধীন জায়গায় ব্যবসা করে আসছি। আগে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা বড় করতে পারতাম। এখন ঋণ সুবিধা না থাকায় অনেকেই মূলধন-সংকটে পড়েছেন, ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে গেছে। সরকার যদি পুনরায় ঋণ চালু করে, তাহলে ব্যবসা সম্প্রসারণ, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থানীয় অর্থনীতি চাঙা হবে।”

আরেক ব্যবসায়ী মুমিনুল হক বলেন, “বর্তমানে অধিকাংশ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মূলধনের অভাবে ব্যবসা চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। নতুন উদ্যোক্তারা ব্যাংক ঋণ না পাওয়ায় ব্যবসা শুরু করতে পারছেন না। ফলে অনেক তরুণ কর্মসংস্থানের সুযোগ হারাচ্ছেন। বাজার ফান্ডের ঋণ পুনরায় চালু হলে ব্যবসায়ীরা ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন এবং পার্বত্য অঞ্চলের অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।”

পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান কাজী মো. মজিবর রহমান বলেন, “খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানের জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, বাজার ফান্ড প্রশাসক, জেলা প্রশাসক, বিভাগীয় কমিশনার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আন্তরিক হলে খুব দ্রুত এই সমস্যার সমাধান সম্ভব। বাজার ফান্ডের ঋণ বন্ধ হওয়ার পর তিন পার্বত্য জেলায় ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় ধরনের স্থবিরতা সৃষ্টি হয়েছে। কর্মসংস্থান কমে গেছে, বিনিয়োগ বন্ধ হয়ে গেছে এবং স্থানীয় অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ ও সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বান্দরবান দেশের অন্যতম দরিদ্র জেলায় পরিণত হয়েছে। তাই অবিলম্বে বাজার ফান্ডভিত্তিক রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ঋণ কার্যক্রম পুনরায় চালু করা প্রয়োজন।”

এই বিষয়ে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক থানাজামা লুসাই জানান, ঋণের বিষয়টি জেলা প্রশাসনের প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও রেজিস্ট্রেশনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। জেলা প্রশাসনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে ব্যবসায়ীরা আবারও ঋণ সুবিধা পাবেন।

বান্দরবানের জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস বলেন, “এ বিষয়ে ইতোমধ্যে তিন দফা সভা হয়েছে। আমি বাজার ফান্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দিতে বলেছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ নথিপত্র আমাদের কাছে জমা পড়েনি। কাগজপত্র পাওয়া গেলে আইন ও বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

অন্যদিকে, বাজার ফান্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. নাছির উদ্দীন জানান, জেলা প্রশাসক ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথিপত্র সংগ্রহের কাজ চলছে। খুব শিগগিরই সব নথিপত্র সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হবে।