দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া এবং উত্তাল সাগরের কারণে মাছ ধরতে না পেরে চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন ভোলার লক্ষাধিক জেলে। সরকারি নিষেধাজ্ঞা এবং ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে দিন দিন তারা বেপরোয়া ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন, যা তাদের জীবন ও জীবিকাকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

ভোলার দৌলতখানের মেঘনা নদীর পাড়ে পাতার খাল এলাকায় দেখা গেছে, সারিবদ্ধভাবে নোঙর করে রাখা হয়েছে সাগরগামী মাছ ধরার ট্রলারগুলো। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘন ঘন লঘুচাপের ফলে সাগর প্রচণ্ড উত্তাল হয়ে ওঠায় গত প্রায় এক মাস ধরে সাগরে যেতে পারছেন না জেলেরা। ফলে তারা এখন বেকার হয়ে পড়েছেন।

মৎস্যজীবীদের সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘ ৫৮ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা শেষে তারা আশা নিয়ে সাগরে নামলেও আকস্মিক দুর্যোগে ট্রলার মালিক ও জেলেদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। তীব্র ঝোড়ো বাতাস ও বিশাল ঢেউয়ের কারণে গত এক মাস ধরে তারা ঘাটে নিরাপদ আশ্রয় নিয়ে আছেন, যার ফলে তারা অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

সাগরগামী ট্রলারের মাঝি রফিকুল ইসলাম বলেন, “৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে তিন লাখ টাকা খরচ করে বাজার-সদাই নিয়ে সাগরে গিয়েছিলাম। কিন্তু মাছ বিক্রি করতে পেরেছি মাত্র দুই লাখ টাকার মতো। এখনও এক লাখ টাকার দেনা মাথায়। সেই দেনা শোধ করতে আবার সাগরে যাওয়ার কয়েকবার প্রস্তুতি নিলেও বৈরী আবহাওয়া ও উত্তাল সাগরের (দমা) কারণে যেতে পারছি না। গত এক মাস ধরে ধারদেনা করে আমাদের পরিবার চলছে। এভাবে চললে না খেয়ে মরতে হবে, তা না হলে পেশা ছেড়ে দিতে হবে।”

আরেক মাঝি শহীদুল হক জানান, ২০ বছর ধরে তিনি সাগরে মাছ ধরছেন। তবে এখন সাগর আগের চেয়ে অনেক বেশি উত্তাল থাকে। তিনি বলেন, “বর্তমানে নদীতে ইলিশের বড় মৌসুম চললেও ইলিশের দেখা নেই। ভেবেছিলাম সাগরে গিয়ে মাছ ধরে ধারের টাকা শোধ করব, কিন্তু সাগরের বৈরী পরিস্থিতির কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। আমাদের আয়ের ওপরই সংসার ও ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চলে। পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে সাগরে অবিরত অবরোধ চলছে। সরকার এখন পাশে না দাঁড়ালে জীবন চালানো কঠিন হয়ে পড়বে।”

দৌলতখানের ভবানীপুর এলাকার সিরাজ মাঝি তার অসহায়ত্বের কথা জানিয়ে বলেন, “সাগরে যেতে না পেরে এক মাস ধরে বেকার বসে আছি। দোকানে বাকি খেতে খেতে এখন দোকানদারও আর বাকিতে জিনিসপত্র দিতে চায় না। এনজিওর ঋণের কিস্তির জন্য লোক এসে তাগাদা দিচ্ছে। মাছই যদি ধরতে না পারি, ঋণ পরিশোধ করব কীভাবে? এখন পরিবার নিয়ে পালিয়ে থাকা ছাড়া উপায় নেই।”

ট্রলার চলাচল বন্ধ হওয়ায় কেবল জেলেরা নন, স্থবির হয়ে পড়েছে ঘাটের ব্যবসাও। দৌলতখানের বরফ ব্যবসায়ী সবুজ জানান, সাগরে বোট না যাওয়ায় বরফ বিক্রি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে, যার ফলে বিদ্যুতের বিল পরিশোধ করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে।

এই পরিস্থিতি বিষয়ে ভোলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ দেলোয়ার হুসাইন বলেন, “বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের কারণে সমুদ্র উত্তাল হয়ে উঠেছে। তাই উপকূলের সব জেলেকে নিরাপদে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে তাদের সাগরে যাওয়ার অনুরোধ জানানো হচ্ছে। এ ছাড়া এই সংকটকালে জেলেদের জন্য খাদ্য সহায়তার আবেদন জানিয়ে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চিঠি পাঠিয়েছি। তারা বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন।”

উল্লেখ্য, ভোলা জেলার সাতটি উপজেলায় সাগরে মাছ শিকারের ওপর নির্ভরশীল জেলের সংখ্যা লক্ষাধিক হলেও সরকারিভাবে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা প্রায় ৬৪ হাজার।