রাজধানী ঢাকায় মাদক সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণকারী ৪০৮ জন শীর্ষ মাদক কারবারির একটি তালিকা প্রস্তুত করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এই তালিকাভুক্ত মাদক গডফাদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গ্রেপ্তারের পাশাপাশি মানি লন্ডারিংয়ের মামলায় এজাহারভুক্ত করার প্রস্তুতি নিচ্ছে সিআইডি।

মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থা (মানস)-এর একটি গবেষণা প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, দেশে বছরে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার মাদক বাণিজ্য হয়। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, প্রায় ৭০ লাখ মাদকসেবী বছরে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেন। এছাড়া মাদক নিরাময় কেন্দ্র, এনজিও ও সরকারি কার্যক্রমে আরও প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। মানসের তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মাদক মামলা বিচারাধীন। সংস্থাটির দাবি, দেশে প্রতি ১৭ জন তরুণের মধ্যে একজন মাদকাসক্ত। মাদকাসক্তদের মধ্যে ৮৪ শতাংশ পুরুষ এবং ১৬ শতাংশ নারী, যাদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশই যুবক।

মানসের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অধ্যাপক ড. অরূপ রতন চৌধুরী বলেন, "দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় মাদক সিন্ডিকেটের মূলহোতাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার বিকল্প নেই।"

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও সিআইডি সূত্র জানিয়েছে, তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের একটি বড় অংশ পর্দার আড়ালে থেকে সংঘবদ্ধ মাদক সিন্ডিকেট পরিচালনা করে। তারা ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকের সরবরাহ ও বিতরণ নিয়ন্ত্রণ করে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) আটটি ক্রাইম জুনে কয়েকশ মাদকের স্পট রয়েছে। মাদক মাফিয়াদের অধীনে মাঠপর্যায়ে সহস্রাধিক খুচরা বিক্রেতা মাদক বিক্রি করছে। সাম্প্রতিক বিশেষ অভিযানে এদের বেশির ভাগই গ্রেপ্তার হয়নি। তাদের ছত্রছায়ায় ডিএমপির ৫০টি থানা এলাকায় সব ধরনের মাদক বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, হোম সার্ভিস, মেসেজিং অ্যাপ, অনলাইন মার্কেটপ্লেস ও কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমেও মাদক সরবরাহ করা হচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ চোরাচালান করে ঢাকায় মাদক প্রবেশ করানো হচ্ছে, যা পরে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া সাতক্ষীরা, যশোর, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা ও ফেনী জেলার সীমান্তপথ ব্যবহার করে মাদক গডফাদাররা মাদক আনছে। উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্ত কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, শেরপুর, ময়মনসিংহ ও নেত্রকনার বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়েও নিয়মিত মাদক আনা হচ্ছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, চলমান বিশেষ অভিযানে এ পর্যন্ত ৫২ লাখ ৫ হাজার ৩৩৪ পিস ইয়াবা, ৫ হাজার ৬৮৯ দশমিক ৮৭ গ্রাম হেরোইন, ২ হাজার ৩৬ বোতল ফেনসিডিল, ৭ হাজার ৭২৫ দশমিক ৭৯ কেজি গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদক জব্দ করা হয়েছে এবং পাঁচ হাজারের বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ বলেন, "মাদক গডফাদারদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। থানা এলাকায় নিয়মিত মাদক উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হয়। বেশির ভাগ অপরাধের মূলেই এই চক্র।"

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, "দেশকে মাদকমুক্ত করতে হলে সবার আগে মাদক গডফাদারদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যদের আরো তৎপর হতে হবে।"

সিআইডির তালিকায় এলাকাভিত্তিক শীর্ষ মাদক কারবারিদের মধ্যে মোহাম্মদপুরে সবচেয়ে বেশি নাম রয়েছে। এর মধ্যে জেনেভা ক্যাম্পের বুনিয়া সোহেল, গলাকাটা মনু, আনোয়ার হোসেন কালু, পিচ্ছি রাজা, জাবেদ ওরফে টিপু, চুয়া সেলিম, জানে আলম ওরফে চোর জানু; রায়েরবাজারের চাপাই আরিফ এবং কৃষি মার্কেট ক্যাম্পের সারফু আরমান ও তাজ উল্লেখযোগ্য।

Hাজারীবাগে সুমন, নিপা আক্তার, সুমি আক্তার, লাকি, আবুল কালাম, আজগর আলী, রোকসানা, মানিক ওরফে জিন্দা মানিক, মো. মমিন মিয়া, মো. আসাদ মিয়া, আবদুস সামাদ, সোনিয়া বেগম, ফালান শিকদার ওরফে ফালান, মো. হযরত ওরফে বসির, মোছা. গালমা আক্তার সাথী ও মো. সজল; কামরাঙ্গীরচরে মো. মনির হোসেন, হাসি, খুরশিদা বেগম ওরফে খুশি, মো. আরমান, মো. রমজান ও মো. ইয়াকুব আলী; কোতোয়ালিতে কুমার নাগ, সাইফুল ইসলাম ওরফে সাগর, পারুলী রানী, মনির হোসেন ওরফে জনি, শম্ভুনাথ সুর, মো. মাইনুদ্দিন, আকরাম, আজিম, জীবন, সাজন প্রসাদ ও জিতু চন্দ্র দাস রয়েছেন।

চকবাজার ও লালবাগে লিটন, চামারু রতন, আরমান হোসেন, তারা মিয়া, শাহিন, রেজাউল, শাওন, মামুন মিয়া, স্বপন, তুহিন, রোজিনা আক্তার, টাইগার বাবুল ওরফে জাক্কি বাবু, সোহেল রানা, শাকিল, সাব্বির, মিজান, জুয়েল, পিসাস আরিফ, হায়দার হোসেন, রোজিনা বেগম, খলিল, মহিন, ইয়াছিন ও সজল; বংশালে হীরা মিয়া, টেক্কা সুমন, বেরী রকি, কাওছার উদ্দিন মানিক, মনির হোসেন ওরফে কোরবান, বিলাল হোসেন শাওন, মুরগি আসিফ, বাপ্পি, সাগর বেপারি ও পারভেজ; ডেমরায় পিচ্ছি হৃদয়, পেটু সোহেল, কান্দি সোহেল, সজীব, এমদাদুল হক, কামাল হোসেন, লিটন, রবিউল ইসলাম ভূঁইয়া, শিশির খান, রফিকুল ইসলাম সুমন, টুটুল আলম ভূঁইয়া, ইয়াকুব আলী, জাকির হোসেন ও সোহেল সাউদ রয়েছেন।

যাত্রাবাড়ীতে ইয়াছিন আহমেদ সাকিব, আমীর হোসেন, চান্দি রতন, মাসুদ তালুকদার দীপু, পিচ্ছি মাসুম, সোর্স রমজান, দেলোয়ার, আসমা আপা, নাজমা আপা, জয়, জজ মিয়া, তেরো সাদ্দাম, বুলেট রতন, আলী ও কামাল; শ্যামপুরে দিনার কাজল, মাসুম মিয়া, তারেক দস্তগীর, কসাই সোহেল, মিতু, মুন্না, হাসু গেম, সাদ্দাম হোসেন, ফেন্সি আরিফ, আবুল হাশেম ও পাপ্পু ওরফে অপু; ওয়ারীতে লাবণী আক্তার, মেজবা আহম্মেদ জিকু, নাসিরুদ্দিন রনি, মিরাজ, আল আমিন ওরফে মানিক, রিপন মিয়া, শহীদুল ইসলাম মুক্তি, করিম ও মনি আক্তার রয়েছেন।

গেণ্ডারিয়ায় রহিমা, মনিরুল হক রবিন, পিচ্ছি রানা, বিকাশ ওরফে প্রকাশ, আমির হোসেন ও লেংড়া মিলন; কদমতলীতে জুলহাস, জাহাঙ্গীর আলম টিটু, বাপ্পারাজ, আবুল হোসেন কালু, সেকান্দার আলী, ইমন হোসেন পিয়াস, সাইদুর রহমান সজীব, কোরবান, ইকবাল, আরমান ওরফে জিতু, স্বপন ও কানা জব্বার; মুগদায় আনোয়ার হোসেন মিলাত, মঞ্জুর হোসেন নিজু, শহিদুল ইসলাম রিন্টু, রাকিবুজ্জামান রবিন, কেরকেরা মাসুদ, লতা আক্তার ও কেরকেরা রিপন রয়েছেন।

সবুজবাগে চম্পা, ময়না, শামীম, তানিয়া, মিলন, দিবা আক্তার, টেস্টি বাবু, আশিকুর রহমান শান্ত ও খোরশেদ; পল্টনে আলী আজম, লালন, শরীফ, হানিফ, চাঁদনী আক্তার, রুবিনা, পাখি ওরফে নিপা, আকাশ হাওলাদার ওরফে সাগর, জাহাঙ্গীর হোসেন রনি ও শরীফ আলম; মতিঝিলে শুকুর আলী, তানিয়া, ক্যাসেট সোহেল, রুবেল মিয়া, হীরা, শাকিল সিদ্দিক ও আমিন রয়েছেন।

খিলগাঁওয়ে খালেদ মিয়া, বাবুল মোল্লা, মাইনউদ্দিন, শাহজালাল ও আল আমিন ভূঁইয়া; শাহজাহানপুরে হারিছ মিয়া, আশরাফুল আলম হীরা, সজল হোসেন, শাওন চৌধুরী, শাহাবুদ্দিন সাবু, দেলোয়ার হোসেন, মানিক হোসেন, কানা সোহেল ও দাঁতকাটা কামাল; রামপুরায় সোহেল, ছারজিনা, সজল হাওলাদার, ফাতেমা আক্তার ফতেহ, পেন্ডি সোহাগ, আমিরুল ইসলাম, ইরিন, মহিউদ্দিন শিপলু, রিফাত ও ফজলে রাব্বি রয়েছেন।

মিরপুরে মিঠু, সাইফুল ইসলাম পাখি, এবাদুল ইসলাম বাদল, বকুলী পারুল, শামীম, শাহজাহান আবেদীন লিটন, বিষু, রুবেল হাসান, নয়ন, শাকিল, শফিউল ইসলাম নীরব, শাহীন ইসলাম জীবন, জুবায়ের হোসেন রাসেল, জনি, কাইল্যা মনির, নাসির, ইমরান, সুলতান, রিয়াজুল ইসলাম শাওন, মহসীন, মাসুদুর রহমান রানা, ফজলুল করিম সাকিল, হাসান ও উজ্জ্বল; ভাসানটেকে রূপচান খান, মোর্মেদা বেগম ও বাবলু; রূপনগরে সালেহা বেগম, সোহাগ শিকদার ও সাহাবুদ্দিন শিকদার; শাহ আলীতে পারুল বেগম, আজগর আলী, পাপন, মনির হোসেন, কাঁকড়া জাকির, আশিক ও সাদ্দাম মিয়া রয়েছেন।

গুলশানে শাহজাহান সাজু, মিলন, শাহাবুদ্দিন, শামসুল হক, ডিস আলামিন, শুভ আহমেদ তাওছিন আকন, আলামিন ও হেনা বেগম; বনানীতে জিলুর রহমান, এরশাদ মিয়া, সাগর হোসেন মনির, টোকাই আনোয়ার, লিটন, বরিশাইলা নাসির, মিজানুর রহমান, সাততলা বস্তির আইলশা মনির, ঘাড়কাটা বাবুল, রনি ও জাহিদুল ইসলাম; ভাটারায় রুবেল মিয়া, রাজু আহম্মেদ, ইতি, আনোয়ারা বেগম, রুস্তম হোসেন বিপ্লব ও মরিয়ম আক্তার মেরি; খিলক্ষেতে পারভীন আক্তার, আরিফ, সেলিম, রায়হান, আক্তার হোসেন, আফাজ উদ্দিন, আরিয়ান রহমান, মহসিন মোল্লা, জামাল হোসেন ও মুরাদ হাসান; ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় ইয়াবা জামাল, পারভেজ, কসাই রুবেল ওরফে গরু রুবেল ও রূপচান রয়েছেন।