দুপুর গড়িয়ে আসতেই টাঙ্গাইল শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে মানুষের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। কেউ রিকশাচালক, কেউ ফুটপাতের দোকানদার, কেউ দিনমজুর, আবার কেউ পথচারী—সবার হাতে দেখা যায় একই ধরনের একটি কুপন। পাঁচ টাকা জমা দিলেই পাওয়া যাচ্ছে ধোঁয়া ওঠা চিকেন খিচুড়ির একটি প্যাকেট।
শহরের নিরালা মোড় এলাকার ফুটপাতের দোকানদার নজরুল ইসলাম কুপন হাতে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি বলেন, ‘এখানে মাসে দুইবার পাঁচ টাকায় খাবার পাই। বিনা মূল্যে দিলে নিতে সংকোচ লাগত। কিন্তু পাঁচ টাকা দিয়ে কিনে খেতে ভালো লাগে।’
রোববার দুপুরে টাঙ্গাইল শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা যায়, এক পাশে বড় বড় হাঁড়িতে রান্না করা চিকেন খিচুড়ি প্যাকেট করার কাজ করছেন কয়েক শিক্ষার্থী। কেউ প্যাকেটগুলো সাজিয়ে রাখছেন, কেউ কুপন দিচ্ছেন, আবার কেউ সারিবদ্ধ মানুষের হাতে খাবার তুলে দিচ্ছেন। আয়োজন ঘিরে কোনো হইচই বা বিশৃঙ্খলা দেখা যায়নি; স্বেচ্ছাসেবকদের তৎপরতায় সুষ্ঠুভাবে এগিয়ে চলে পুরো কর্মসূচি। আয়োজনটির নাম ‘৫ টাকার আহার’। পরিচালনা করছে শিক্ষার্থীদের সংগঠন ‘সর্বদা নির্ভীক ফাউন্ডেশন’।
ভিক্টোরিয়া সড়কের চা–দোকানি জোমেলা বেগম খাবার নিতে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘৫ টাকায় খাবার পাওয়ায় আমাগো মতো গরিব মানুষের খুব সুবিধা হইছে। নামমাত্র টাকায় পেট ভইরা খাওয়া যায়।’
সংগঠনটির যাত্রা শুরু ২০২৪ সালে। প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দা তাসমো সরকারি সাদত কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সম্মান প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালে বন্যার সময় বন্ধু শেখ সাদি ও আমি অন্য বন্ধুদের নিয়ে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করি। সে সময় যারা এই কাজে ছিল, তাদের নিয়েই এই সংগঠন গড়ে তোলা হয়। পরে রক্তদান, অসহায় রোগীদের চিকিৎসায় আর্থিক সহায়তা, বৃক্ষরোপণসহ বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি চালু করি ৫ টাকার আহার কর্মসূচি।’
বর্তমানে সংগঠনটির সদস্য ১৩৭। সংগঠনের সভাপতি শাহীন সরকার জানান, সদস্যরা মাসে ১০০ টাকা করে চাঁদা দেন। এ ছাড়া বিভিন্ন শুভাকাঙ্ক্ষীও সহায়তা করেন। সাধারণত প্রতি মাসের দ্বিতীয় ও চতুর্থ শুক্রবার শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে পাঁচ টাকার বিনিময়ে খাবার বিতরণ করা হয়। কোনো কারণে সেদিন সম্ভব না হলে পরবর্তী সুবিধাজনক দিনে আয়োজন করা হয়। বাজার করা থেকে শুরু করে রান্না ও প্যাকেটজাত করা—সব কাজ সদস্যরাই নিজেরা করেন। প্রতিবার ৫০০ থেকে ৮০০ মানুষের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। কখনো চিকেন খিচুড়ি, কখনো চিকেন বিরিয়ানি পরিবেশন করা হয়।
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মারুফ শিকদার বলেন, ‘আমাদের স্বপ্ন মাসে দুই দিন নয়, প্রতিদিনই মানুষের জন্য পাঁচ টাকার আহারের ব্যবস্থা করা। নামমাত্র দামে মানুষ খাবার নিয়ে তৃপ্তিসহকারে খায়। এটা আমাদের খুব ভালো লাগে।’
রাস্তায় মানুষের কাছে হাত পেতে চলে কোরবান আলীর জীবন। কখনো খাবার জোটে, আবার কখনো জোটে না। রোববার পাঁচ টাকায় খিচুড়ি কিনে খেতে পেরে তাঁর মুখে ছিল তৃপ্তির হাসি। তিনি বলেন, ‘এখান দিয়া যাওয়ার সময় দেখলাম মাত্র ৫ টাকায় খাওন দিতাছে। তাই খাইতে পারলাম।’
টাঙ্গাইলের সরকারি এম এম আলী কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শামসুল হুদা মনে করেন, শিক্ষার্থীদের এই উদ্যোগে সমাজের বিত্তবান মানুষ এগিয়ে এলে কর্মসূচিটি আরও বড় পরিসরে পরিচালনা করা সম্ভব হবে। সামর্থ্যের চেয়ে স্বপ্ন বড়—এই বিশ্বাস নিয়েই মাসে দুই দিন শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে মানুষের হাতে খাবার তুলে দেন শিক্ষার্থীদের একটি দল। তাঁদের লক্ষ্য, ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে বড় পুঁজি নয়, প্রয়োজন আন্তরিকতা। আর সেই আন্তরিকতার নাম—‘৫ টাকার আহার’।