দীর্ঘদিন ধরেই অভিনয় থেকে দূরে আছেন জ্যোতিকা জ্যোতি। তাঁর দাবি, কেউ তাঁকে অভিনয়ের জন্য ডাকছেন না। তিনি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন জায়গায় তাঁকে ‘ব্ল্যাক লিস্টেড’ করে রাখা হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমেও নানা বিতর্কের কেন্দ্রে থাকার কথা উল্লেখ করেন তিনি। এসব পরিস্থিতি সহ্য করতে না পেরে গত সোমবার সন্ধ্যায় ফেসবুক লাইভে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন জ্যোতিকা জ্যোতি। তিনি জানান, মানসিকভাবে তিনি ভীষণ বিপর্যস্ত; কাজও পাচ্ছেন না। তাঁর ভাষ্য, নানা মহল থেকে তাঁকে পরিকল্পিতভাবে একঘরে করে রাখা হচ্ছে। আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি বলেন, ‘এই বাংলাদেশে জন্ম নিয়েই ভুল করেছি।’
ফেসবুক লাইভে জ্যোতিকা জ্যোতি বলেন, তিনি নিজেকে ‘হেল্পলেস’ অনুভব করছেন। তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে তাঁকে নিয়ে ট্রল, কটূক্তি ও ব্যক্তিগত আক্রমণ চলছে। সামাজিক মাধ্যম ছাড়াও পেশাগত জীবনেই নানা ধরনের বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
জ্যোতিকা জ্যোতির দাবি, একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী তাঁকে পরিকল্পিতভাবে কাজ থেকে দূরে রাখছে। তবে সেই গোষ্ঠীর নাম তিনি প্রকাশ করেননি। বিভিন্ন গ্রুপিংয়ের কারণে নতুন কোনো কাজ পাচ্ছেন না বলেও জানান তিনি। ফলে একপ্রকার ঘরবন্দী জীবন কাটাতে হচ্ছে বলে দাবি করেন। একই সঙ্গে বর্তমান সরকারের কাছে আবেদন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এর একটা শেষ করেন, প্লিজ।’
জ্যোতিকা জ্যোতির রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। বহুল আলোচিত ‘আলো আসবেই’ হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের অন্যতম সদস্য ছিলেন তিনি। আওয়ামী লীগ সমর্থক শিল্পী হিসেবে পরিচিত থাকায় ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর তাঁকে নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এর আগে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিকে ঘিরেও জ্যোতিকা জ্যোতির নাম আলোচনায় আসে। সে সময় তিনি প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা বিভাগের পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন। সামাজিক মাধ্যমে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে, তাঁকে অফিসকক্ষে আটকে রাখা হয়েছে। পরে ফেসবুক লাইভে এসে ঘটনার নিজের বর্ণনা দেন তিনি। সেই লাইভে কান্নাজড়িত কণ্ঠে জ্যোতি বলেছিলেন, ‘চলমান পরিস্থিতির কারণে তাঁকে অফিসে যেতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছিল। তবু চাকরির দায়িত্ববোধ থেকে তিনি অফিসে যান। সেখানে গিয়ে উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশ দেখতে পান। পরে মহাপরিচালকের সঙ্গে কথা হলে তিনি পরিস্থিতি বিবেচনায় অফিস ছাড়ার পরামর্শ দেন।’
জ্যোতি জানান, নিজের কক্ষ থেকে ব্যক্তিগত জিনিসপত্র গুছিয়ে বের হওয়ার সময় তিনি বাইরে থাকা লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলেন, কিন্তু কেউ তাঁর সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি। সে অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘যে মুখগুলো আগে পরিচিত ছিল, সেগুলো সেদিন খুব অপরিচিত লাগছিল।’ কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন অভিনেত্রী।
ফেসবুক লাইভে জ্যোতিকা জ্যোতি দাবি করেন, দুই বছর ধরে তাঁর হাতে তেমন কোনো কাজ নেই। এ সময়ের মধ্যে তাঁকে নিয়মিত অনলাইনে হয়রানি, কটূক্তি ও ব্যক্তিগত আক্রমণের শিকার হতে হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। আর্থিক সংকটের কথাও তুলে ধরে তিনি বলেন, অনেক সময় বাবা-মায়ের কাছ থেকে সাহায্য নিতে হচ্ছে, যা তাঁকে আরও মানসিকভাবে ভেঙে দিচ্ছে।
ফেসবুকে লাইভে তিনি অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের পর থেকে তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অপপ্রচার ও হয়রানি বাড়তে থাকে। নিজের রাজনৈতিক ও আদর্শিক অবস্থানের কারণে একাধিক পক্ষের সমালোচনা, হুমকি এবং অনলাইন বুলিংয়ের মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে তাঁর দাবি। তিনি আরও জানান, তাঁর বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে। দীর্ঘ সময় নিরাপত্তার কারণে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারেননি বলে জানান তিনি। বিভিন্ন সময় তাঁকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য ও ব্যক্তিগত আক্রমণ করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন জ্যোতিকা।
জ্যোতিকা জানান, এসব ঘটনার প্রভাব পড়েছে তাঁর পেশাগত জীবনেও। তিনি বলেন, ‘আমি কারও কাছে গিয়ে কাজ চাইতে পারি না। আপস করেও কাজ করতে পারি না। আমার জীবনটা নরকের মতো হয়ে গেছে।’
লাইভে তিনি বর্তমান সরকারের প্রতি আবেদন জানিয়ে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতির অবসান চান। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের মানসিক চাপের কারণে শারীরিকভাবেও অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলে জানান।
ফেসবুক লাইভের একেবারে শেষ দিকে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে জ্যোতিকা জ্যোতি বলেন, ‘আমি হেল্পলেস। আমি দুঃখিত, এভাবে আমার দুর্বলতা প্রকাশ করতে হলো। কিন্তু আমার আর শক্তি নেই। আমার মনে হচ্ছে, আমি আর ঘুরে দাঁড়াতে পারব না।’
২০০৪ সালে একটি সুন্দরী প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বিনোদন অঙ্গনে পথচলা শুরু করেন ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর জ্যোতিকা জ্যোতি। টেলিভিশন নাটকের পাশাপাশি তিনি অভিনয় করেছেন ‘আয়না’, ‘নন্দিত নরকে’, ‘জীবনঢুলি’, ‘অনিল বাগচীর একদিন’, ‘মায়া: দ্য লস্ট মাদার’, ‘লাল মোরগের ঝুঁটি’ এবং কলকাতার ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’সহ বেশ কয়েকটি আলোচিত চলচ্চিত্রে।