ভারতীয় কমেডির ইতিহাসে এমন শিল্পীও আছেন, যাঁরা শুধু দর্শককে হাসান না—নিজের অভিনয় দিয়েও বারবার চমকে দেন। সুনীল গ্রোভার তাঁদের অন্যতম উদাহরণ। টেলিভিশনের দর্শকের কাছে তিনি ‘গুথি’, ‘ডক্টর মশহুর গুলাটি’ কিংবা ‘রিঙ্কু ভাবি’; আর সিনেমাপ্রেমীদের কাছে তিনি শক্তিশালী চরিত্রাভিনেতা। পর্দায় তাঁর অদ্ভুত হাস্যরসের পেছনেও রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রাম, প্রত্যাখ্যান, অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই, বিতর্ক এবং নতুন করে উঠে দাঁড়ানোর গল্প।
আজ তাঁর জন্মদিন। এ উপলক্ষে দেখে নেওয়া যাক ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় কমেডিয়ান ও অভিনেতা সুনীল গ্রোভারের জন্ম ও বেড়ে ওঠা, ক্যারিয়ার, বিতর্ক এবং সাফল্যের ধারাবাহিকতা।
১৯৭৭ সালের ৩ আগস্ট ভারতের হরিয়ানার সিরসায় জন্ম সুনীল গ্রোভারের। তাঁর বাবা ছিলেন ব্যাংককর্মী। ছোটবেলা থেকেই অভিনয় ও মিমিক্রির প্রতি আগ্রহ ছিল প্রবল। স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বিভিন্ন অভিনেতার কণ্ঠ নকল করে সবাইকে হাসাতেন। পরে তিনি চণ্ডীগড়ের পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়-সংযুক্ত থিয়েটার বিভাগ থেকে অভিনয়ে প্রশিক্ষণ নেন। সেই সময়ই তিনি বুঝতে পারেন, অভিনয়কেই পেশা হিসেবে বেছে নিতে চান।
মুম্বাইয়ে এসে তবে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল কঠিন বাস্তবতা। অডিশনের পর অডিশন দিয়েও বড় কোনো সুযোগ মিলছিল না। টেলিভিশনে ছোট ছোট চরিত্র, বিজ্ঞাপন আর ডাবিং করেই দিনের পর দিন কাটাতে হয়েছে।
অভিনয়ে সাফল্যের আগে সুনীল গ্রোভার রেডিও জকিও ছিলেন। জনপ্রিয় রেডিও অনুষ্ঠান ‘হাসি কে ফোয়ারে’ তাঁকে শ্রোতাদের কাছে পরিচিত করে তোলে। এরপর ধীরে ধীরে টেলিভিশনে সুযোগ বাড়তে থাকে। তবে তখনও তিনি ছিলেন মূলত পার্শ্বচরিত্রের অভিনেতা—জনপ্রিয়তা তখনো বহু দূরে।
২০১৩ সালে আসে তাঁর জীবনের বড় মোড়। কপিল শর্মার অনুষ্ঠান ‘কমেডি নাইটস উইথ কপিল’-এ ‘গুথি’ চরিত্রে অভিনয় করে রাতারাতি তারকা হয়ে ওঠেন সুনীল। লম্বা বেণি, অদ্ভুত হাঁটার ভঙ্গি, বিচিত্র সংলাপ—এসব মিলিয়ে গুথি দ্রুতই ভারতীয় টেলিভিশনের অন্যতম জনপ্রিয় কমেডি চরিত্রে পরিণত হয়। এরপর আসে ‘রিঙ্কু ভাবি’ ও ‘ডক্টর মশহুর গুলাটি’। বিশেষ করে ‘ডক্টর গুলাটি’র চরিত্রটি তাঁকে এমন উচ্চতায় নিয়ে যায়, যেখানে অনেক সময় দর্শক অনুষ্ঠানটির চেয়ে তাঁর অভিনয়ের জন্যই অপেক্ষা করতেন। অনেকেই মনে করেন, সে সময় কপিল শর্মার অনুষ্ঠানের জনপ্রিয়তার অন্যতম বড় স্তম্ভ ছিলেন সুনীল গ্রোভার।
কপিল শর্মার সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে বড় আলোচনাও আসে। ২০১৭ সালে অস্ট্রেলিয়া সফর শেষে বিমানে কপিল শর্মা ও সুনীল গ্রোভারের মধ্যে তুমুল বাগ্বিতণ্ডার খবর প্রকাশ্যে আসে। খবরে দাবি করা হয়, কপিল নেশাগ্রস্ত অবস্থায় সুনীলের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছিলেন। ঘটনার পর সুনীল অনুষ্ঠান ছেড়ে দেন। এই বিচ্ছেদ ভারতীয় টেলিভিশনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি হয়ে ওঠে। ভক্তরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েন। অনেকেই মনে করেছিলেন, অনুষ্ঠানটির মান আগের মতো আর থাকেনি।
পরে কপিল একাধিকবার প্রকাশ্যে ক্ষমা চান। দীর্ঘ কয়েক বছর দূরত্ব বজায় রাখার পর অবশেষে দুজন আবার একসঙ্গে কাজ করেন ‘দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান কপিল শো’-তে। দর্শকের কাছে সেটি ছিল বহুল প্রতীক্ষিত পুনর্মিলন।
সুনীল গ্রোভারকে শুধু কৌতুক অভিনেতা হিসেবে দেখলেও, গত কয়েক বছরে তিনি নিজেকে শক্তিশালী অভিনেতা হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ‘বাগি’, ‘ভারত’, ‘গুডবাই’, ‘জওয়ান’, ‘তাণ্ডব’, ‘সানফ্লাওয়ার’ ইত্যাদি সিনেমা ও সিরিজে হাসির চরিত্রের বাইরে গিয়ে আবেগঘন ও জটিল চরিত্রেও তাঁকে দেখা যায়। বিশেষ করে শাহরুখ খানের ‘জওয়ান’ ছবিতে তাঁর অভিনয় নিয়ে দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসাও এসেছে।
২০২২ সালে আবারও তাঁর জীবন নিয়ে নতুন করে খবর ছড়ায়। হৃদ্যন্ত্রে সমস্যা ধরা পড়েছে সুনীল গ্রোভারের। তাঁর বাইপাস সার্জারি হয়। এ খবর ভক্তদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছিল। অস্ত্রোপচারের পর দীর্ঘ বিশ্রাম নিলেও খুব দ্রুত কাজে ফিরে আসেন তিনি। পরে একাধিক সাক্ষাৎকারে বলেন, এই অভিজ্ঞতা তাঁকে জীবন সম্পর্কে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে।
ব্যক্তিজীবন প্রসঙ্গে বলা হয়, সুনীল গ্রোভার সব সময়ই আড়ালে রাখতে পছন্দ করেন। স্ত্রী আরতি গ্রোভার। তাঁদের এক ছেলে রয়েছে। বলিউডের অনেক তারকার মতো ব্যক্তিজীবন নিয়ে আলোচনায় থাকতে তিনি কখনোই আগ্রহী নন। বিভিন্ন ব্যবসায়িক ও বিনোদনভিত্তিক গণমাধ্যমের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সুনীল গ্রোভারের মোট সম্পদের পরিমাণ আনুমানিক ৩৫ থেকে ৪৫ লাখ ভারতীয় রুপির মধ্যে।
তাঁর আয়ের প্রধান উৎস—টেলিভিশন অনুষ্ঠান, ওটিটি সিরিজ, সিনেমা, ব্র্যান্ড এন্ডোর্সমেন্ট, লাইভ শো, বিভিন্ন করপোরেট ইভেন্ট ইত্যাদি। শোনা যায়, জনপ্রিয় সময়ে একটি টেলিভিশন পর্বের জন্যই তিনি কয়েক লাখ রুপি পারিশ্রমিক নিতেন। ওটিটি ও চলচ্চিত্রে কাজের পর সেই পারিশ্রমিক আরও বেড়েছে। এখন তিনি প্রতি পর্বে ৩০ লাখ রুপি বা ৩৮ কোটি টাকা নেন।
ভারতে কমেডিয়ানের অভাব কখনো ছিল না, কিন্তু সুনীল গ্রোভারকে আলাদা করেছে তাঁর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা। তিনি কোনো চরিত্রকে শুধু কৌতুকের জন্য ব্যবহার করেন না; সেই চরিত্রের নিজস্ব অভ্যাস, ভাষা, শরীরী ভঙ্গি, আবেগ—সবকিছু মিলিয়ে একেবারে জীবন্ত করে তোলেন। এ কারণেই তাঁর চরিত্রগুলো শুধু ভাইরাল নয়, দর্শকের স্মৃতিতেও স্থায়ী হয়ে গেছে।
গত কয়েক বছরে সুনীল গ্রোভার নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তুলেছেন। টেলিভিশনের জনপ্রিয় কমেডিয়ান থেকে এখন তিনি ওটিটি ও চলচ্চিত্রের নির্ভরযোগ্য অভিনেতা। কপিল শর্মার সঙ্গে পুনর্মিলন তাঁর ক্যারিয়ারে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একই সঙ্গে সিরিয়াস চরিত্রেও নিয়মিত অভিনয় করে তিনি প্রমাণ করছেন, নিজেকে এক ঘরানায় আটকে রাখতে চান না। একসময় অডিশনের পর অডিশনে ব্যর্থ হওয়া সেই তরুণ আজ ভারতীয় বিনোদনজগতের অন্যতম পরিচিত মুখ।
ইন্ডিয়া টুডে, টাইমস অব ইন্ডিয়া