মেরুদণ্ডের প্রদাহ ও শক্ত হয়ে যাওয়ার সমস্যা হিসেবে পরিচিত অ্যাংকাইলোজিং স্পন্ডেলাইটিস একটি জটিল রোগ। এই রোগে মেরুদণ্ডে তীব্র ব্যথা হয়, নমনীয়তা হ্রাস পায় এবং শরীর ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে আসে। সাধারণত ২০ থেকে ৪০ বছর বয়সীদের মধ্যে এই রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায় এবং নারীদের তুলনায় পুরুষদের এই সমস্যা বেশি দেখা দেয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রোগের সঠিক কারণ এখনও জানা যায়নি, তবে জিনগত ও পরিবেশগত প্রভাব এখানে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে এইচএলএ-বি২৭ জিনের কারণে এই সমস্যা হয়ে থাকে। এটি মূলত একটি অটোইমিউন প্রদাহজনিত রোগ, যেখানে মেরুদণ্ডের গোড়ার সঙ্গে পেলভিসের সংযুক্ত স্যাক্রো ইলিয়াক জয়েন্টে প্রদাহ সৃষ্টি হয়।

এই রোগের প্রধান লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে মেরুদণ্ডজুড়ে ব্যথা, নিতম্বের ব্যথা এবং সকালে ব্যথার তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়া। অনেক ক্ষেত্রে মেরুদণ্ড জমাট বেঁধে যায় এবং বাঁকানো অসম্ভব হয়ে পড়ে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে 'ব্যাম্বু স্পাইন' বা বাঁশের মতো মেরুদণ্ড বলা হয়। এছাড়া অবিরাম ক্লান্তি, হাঁটু, কাঁধ ও গোড়ালির সন্ধিতে ব্যথা, হাড়ের ওপর লাগানো টেন্ডন ও লিগামেন্ট প্রবেশের স্থানে ব্যথা (এনথেসাইটিস), পাঁজরের জয়েন্টে ব্যথা এবং চোখের প্রদাহ দেখা দিতে পারে।

রোগ নির্ণয়ের জন্য শারীরিক পরীক্ষার পাশাপাশি স্যাক্রো ইলিয়াক জয়েন্টের এক্স-রে করা হয়। প্রয়োজনে পুরো মেরুদণ্ডের এক্স-রে করা হয় যাতে ব্যাম্বু স্পাইনের উপস্থিতি বোঝা যায়। এছাড়া রক্তের এইচএলএ-বি২৭ পরীক্ষার মাধ্যমে রোগটি নিশ্চিত করা হয়।

চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ফিজিওথেরাপি অত্যন্ত কার্যকর। মেরুদণ্ড ও সন্ধিগুলোর নমনীয়তা বজায় রাখতে রেঞ্জ অব মোশন এবং স্ট্রেচিং ব্যায়ামের পাশাপাশি হাঁটা, সাঁতার কাটা ও সাইক্লিংয়ের মতো অ্যারোবিক ব্যায়াম করার পরামর্শ দেওয়া হয়। ফিজিওথেরাপিতে বিশেষ করে স্পাইন মোবিলিটি, ক্যাট ক্যামেল, পেলভিক টিল্ট, পসচার কারেকশন, ওয়াল পসচার এবং চিন টাক ব্যায়াম করানো হয়। এছাড়া পেশি শিথিল করতে হাইড্রোথেরাপি এবং প্রদাহ কমাতে তাপ ও ঠান্ডা থেরাপি ব্যবহৃত হয়। ফুসফুসের কার্যক্ষমতা ধরে রাখতে নাক দিয়ে শ্বাস নিয়ে মুখ দিয়ে ছাড়ার বিশেষ পদ্ধতি অনুসরণ করতে বলা হয়।

রিঅ্যাকটিভ ফিজিওথেরাপি সেন্টারের চেয়ারম্যান ও চিফ কনসালট্যান্ট এবং তেজগাঁও, ঢাকার সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. সাইদুর রহমান জানান, ফিজিওথেরাপি অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারে প্রতিটি রোগীর ক্ষেত্রে প্রথমে একটি বিস্তারিত শারীরিক মূল্যায়ন করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় রোগীর মেরুদণ্ড ও সংশ্লিষ্ট সন্ধিগুলোর গতি, শক্তি, ব্যথার মাত্রা ও দৈনন্দিন কার্যক্ষমতা মূল্যায়ন করা হয় এবং এরপর রোগীর অবস্থার ভিত্তিতে বিশেষ ব্যবস্থাপনা করা হয়।

সুস্থ থাকতে ধূমপান সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করার পাশাপাশি নিয়মিত সাঁতার কাটা, নরম বিছানা ব্যবহার, নিয়মিত ব্যায়াম, ভিটামিনসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ এবং পরিমিত পানি পানের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।