তীব্র গরমের সময়ে এসি এখন অনেকের জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে মাস শেষে বিদ্যুৎ বিলের অংক দেখে অনেকের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে। প্রচলিত ধারণা হলো, এসি ব্যবহার করলেই বিদ্যুৎ বিল আকাশচুম্বী হয়। তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন; এসি ব্যবহারের সঠিক কৌশলের ওপরই নির্ভর করে বিদ্যুৎ খরচের পরিমাণ।
দৈনন্দিন অভ্যাসে সামান্য কিছু পরিবর্তন আনলে এসির আরাম বজায় রেখেও বিদ্যুৎ বিল তুলনামূলকভাবে কমিয়ে রাখা সম্ভব। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের কার্যকর ১২টি উপায় নিচে আলোচনা করা হলো:
তাপমাত্রা ২৪ থেকে ২৬ ডিগ্রিতে রাখা: দ্রুত ঘর ঠান্ডা করার জন্য অনেকে তাপমাত্রা ১৮ বা ২০ ডিগ্রিতে সেট করেন। এতে কম্প্রেসারের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে এবং বিদ্যুৎ খরচ বেড়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২৪ থেকে ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা আরামদায়ক হওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সহায়ক।
ফ্যানের সমন্বয়: এসি চালানোর পাশাপাশি সিলিং ফ্যান বা স্ট্যান্ড ফ্যান ব্যবহার করলে ঠান্ডা বাতাস দ্রুত পুরো ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে এসির ওপর চাপ কমে এবং খুব কম তাপমাত্রা সেট করার প্রয়োজন হয় না।
দরজা-জানালা বন্ধ রাখা: এসি চালু থাকা অবস্থায় দরজা বা জানালা খোলা রাখলে বাইরে থেকে গরম বাতাস প্রবেশ করে। এতে ঘর ঠান্ডা রাখতে এসিকে দীর্ঘক্ষণ কাজ করতে হয়, যা বিদ্যুৎ খরচ বাড়িয়ে দেয়। তাই দরজা-জানালার ফাঁকফোকর ভালোভাবে বন্ধ রাখা জরুরি।
নিয়মিত ফিল্টার পরিষ্কার: ফিল্টারে ধুলা জমে বাতাস চলাচলে বাধা সৃষ্টি হলে কাঙ্ক্ষিত তাপমাত্রায় পৌঁছাতে এসিকে বেশি পরিশ্রম করতে হয়। প্রতি দুই থেকে চার সপ্তাহ অন্তর ফিল্টার পরিষ্কার করলে এসির কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং বিদ্যুৎ খরচ কমে।
সূর্যের আলো নিয়ন্ত্রণ: দিনের বেলা জানালা দিয়ে সরাসরি রোদ ঢুকলে ঘরের তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে যায়। পর্দা, ব্লাইন্ড বা সানশেড ব্যবহার করলে ঘর ঠান্ডা থাকে এবং এসি কম সময় কাজ করে।
প্রয়োজন ছাড়া বন্ধ রাখা: ঘরে কেউ না থাকলেও অনেকে এসি চালু রেখে দেন, যা অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ খরচের কারণ। দীর্ঘ সময়ের জন্য বাইরে গেলে অবশ্যই এসি বন্ধ করে বের হওয়া উচিত।
স্লিপ মোড ব্যবহার: আধুনিক এসিতে থাকা স্লিপ মোড রাতে ঘুমের সময় ধীরে ধীরে তাপমাত্রা সামান্য বাড়িয়ে দেয়। ঘুমের সময় শরীরের ঠান্ডার প্রয়োজনীয়তা কমে যাওয়ায় এই মোড আরাম বজায় রাখার পাশাপাশি বিদ্যুৎ সাশ্রয় করে।
টাইমার সেট করা: সারারাত এসি না চালিয়ে টাইমার ব্যবহার করা যেতে পারে। যেমন, ঘুমানোর পর তিন থেকে চার ঘণ্টা পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হওয়ার ব্যবস্থা করলে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয়।
নিয়মিত সার্ভিসিং: দীর্ঘ সময় সার্ভিসিং না করলে এসির কুলিং ক্ষমতা কমে যায়। গ্যাসের পরিমাণ বা কয়েলের সমস্যা থাকলে বিদ্যুৎ খরচ বেড়ে যায়। তাই বছরে অন্তত একবার দক্ষ টেকনিশিয়ান দিয়ে সার্ভিসিং করানো শ্রেয়।
ইনভার্টার এসির ব্যবহার: নতুন এসি কেনার ক্ষেত্রে ইনভার্টার প্রযুক্তির এসি বিবেচনা করা যেতে পারে। এই প্রযুক্তির কম্প্রেসার প্রয়োজন অনুযায়ী গতি পরিবর্তন করে, ফলে নন-ইনভার্টার এসির তুলনায় দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ খরচ কম হয়।
তাপ উৎপাদনকারী যন্ত্রের সীমিত ব্যবহার: এসি চলাকালীন ওভেন, ইস্ত্রি বা হিটারের মতো তাপ উৎপাদনকারী যন্ত্র ব্যবহার করলে ঘরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। এতে এসিকে আরও বেশি কাজ করতে হয়, তাই সম্ভব হলে এসব যন্ত্র অন্য সময়ে ব্যবহার করা উচিত।
সঠিক ক্ষমতার এসি নির্বাচন: ঘরের আয়তন অনুযায়ী এসি নির্বাচন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ছোট ঘরে অতিরিক্ত বড় বা বড় ঘরে ছোট এসি ব্যবহার করলে কাঙ্ক্ষিত শীতলতা পাওয়া যায় না এবং বিদ্যুৎ খরচ বেড়ে যায়।
পরিশেষে, এসি ব্যবহার করলেই যে বিল অনেক বেশি হবে, তা সঠিক নয়। তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, স্লিপ মোড ও টাইমারের সঠিক ব্যবহার এবং ঘর ভালোভাবে বন্ধ রাখার মতো ছোট ছোট অভ্যাসগুলোই মাস শেষে বিদ্যুৎ বিল কমাতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
সূত্র: টিসিএল, সনি র্যাংগস