চাঁপাইনবাবগঞ্জে চলমান ভ্যাপসা গরমের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তীব্র লোডশেডিং। দিনরাতের অর্ধেকেরও বেশি সময় বিদ্যুৎ না থাকায় বিপাকে পড়েছেন এইচএসসি পরীক্ষার্থীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ। জেলাজুড়ে বিদ্যুতের চাহিদার তুলনায় গড়ে প্রায় ৩৫ দশমিক ১৩ শতাংশ ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ঘণ্টায় বিদ্যুতের চাহিদা ওঠানামা করে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ বিতরণ বিভাগে শহরাঞ্চলে গড়ে ৩০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে বিদ্যুৎ মিলছে মাত্র ১৭ মেগাওয়াট, যা চাহিদার তুলনায় ৪৩.৩৩ শতাংশ কম। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ বিতরণ বিভাগে ১০.৭ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ায় ঘাটতি প্রায় ৩৪.৫৮ শতাংশ। শিবগঞ্জ পৌর এলাকায় ৬.৫ মেগাওয়াটের বিপরীতে ৩.৫ মেগাওয়াট (৪৬.১৫ শতাংশ ঘাটতি) এবং গোমস্তাপুরে ১০ মেগাওয়াটের বিপরীতে মিলছে মাত্র ৭ মেগাওয়াট (৩০ শতাংশ ঘাটতি)।

গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। চাঁপাইনবাবগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি (পবিস) জানিয়েছে, তাদের এলাকায় প্রতিদিন গড়ে ৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৫৫ থেকে ৬০ মেগাওয়াট। ফলে পুরো জেলাতেই প্রায় ৩৫ শতাংশ ঘাটতি সামাল দিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং করতে হচ্ছে।

পৌর এলাকার বাসিন্দা মো. রাসেল আহমেদ বলেন, "গুমোট গরমের মধ্যে ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারণে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছে শিশু ও বয়স্ক মানুষজন। দুই ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের পর ২০ মিনিট বিদ্যুৎ থাকছে, আবার চলে যাচ্ছে।"

এই সংকট শিক্ষাঙ্গনে প্রভাব ফেলছে। শিবগঞ্জের পরীক্ষার্থী মো. যোবায়ের বলেন, "সামনে পরীক্ষা, অথচ অনবরত লোডশেডিং আর গরমে রাতে ও দিনে ঠিকমতো পড়ালেখাই করা যাচ্ছে না। আইপিএস বা চার্জার ফ্যানের আলোতেও বেশিক্ষণ টেকা যায় না। পড়ার মনোযোগ ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।"

অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও স্থবিরতা নেমে এসেছে। বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, কম্পিউটারের দোকান ও কাঠের ফার্নিচার তৈরির কারখানাগুলো অচল হয়ে পড়েছে। মহরাজপুরের অটোরিকশাচালক মাহিদুল ইসলাম জানান, "রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় গাড়ি ঠিকমতো চার্জ হয় না। ফলে দুপুরের আগেই চার্জ শেষ হয়ে যায় এবং সারাদিন বসে থাকায় আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে পরিবার চালানো দায় হয়ে উঠেছে।"

ফার্নিচার কারখানার কারিগর মো. সাব্বির ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "কারখানায় বিদ্যুৎ না থাকলে আমরা সম্পূর্ণ বেকার। মেশিন চলে না, কাজও এগোয় না। সময়মতো খদ্দেরের কাজ বুঝিয়ে দিতে পারি না, আর কাজ না করলে দিনহাজিরাও মেলে না।"

চাঁপাইনবাবগঞ্জ নেসকোর নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম মোহাইমিনুর রহমান জানান, "জাতীয় পর্যায়ে গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এর প্রভাবেই এই ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তবে সংকট কবে নাগাদ কাটবে তা সুনির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়।"

শিবগঞ্জের আবাসিক প্রকৌশলী জুলফিকার আলী জানান, "চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম পাওয়ায় ঘনঘন লোডশেডিং দিতে হচ্ছে, তবে দ্রুতই সমাধানের আশা করছি।"

অন্যদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার হাওলাদার মো. ফজলুর রহমান জানান, "তারা চাহিদার বিপরীতে গড়ে প্রায় ৭০ শতাংশ বিদ্যুৎ পাচ্ছেন। বরাদ্দ আরও কমে গেলে স্থানীয়ভাবে লোডশেডিংয়ের মাত্রা আরও বেড়ে যায়।"