নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারকে কেবল সরকারি কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
রোববার (২ আগস্ট) রাজধানীর পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) কার্যালয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ক এক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এবং ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতার মালাসহ অন্যান্যরা বক্তব্য রাখেন।
ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, "ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তুলতে প্রাণ-প্রকৃতি, পরিবেশ, জলবায়ু ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার বিকল্প নেই। আর এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে কেন্দ্র করে গণসচেতনতা ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।"
তিনি মনে করেন, সাধারণ মানুষের মধ্যে এই জ্বালানির চাহিদা ও সচেতনতা তৈরি হলে বাজার স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই পথ অনুসরণ করবে। তার ভাষায়, "প্রথম কাজ হচ্ছে মানুষের চাহিদা তৈরি করা। চাহিদা তৈরি হলে সরবরাহও সেই পথেই এগোবে।"
দেশের পূর্ববর্তী সফল সামাজিক কর্মসূচির উদাহরণ টেনে উপদেষ্টা বলেন, "বাংলাদেশে গণসাক্ষরতা অভিযান, খাল খনন কর্মসূচি এবং সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হয়েছিল বলেই সফল হয়েছে। একইভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে এনজিও, নাগরিক সমাজ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে।"
গৃহস্থালি পর্যায়ে সৌরশক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি জানান, এতে গ্যাস ও এলপিজির ওপর নির্ভরতা কমবে, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ব্যয় কমিয়ে সঞ্চয় বাড়াতে সাহায্য করবে। এর ফলে দেশের আমদানি ব্যয় হ্রাস পাবে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা আরও সুদৃঢ় হবে।
সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে তিনি জানান, সৌর প্যানেল, ব্যাটারি ও ইনভার্টারের মতো প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি দেশে উৎপাদনে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। বিনিয়োগ আকর্ষণে কর-কাঠামোয় পরিবর্তন আনা হয়েছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন স্কিমসহ সহজ অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণে কাজ চলছে।
এনজিওগুলোর ভূমিকা প্রসঙ্গে ড. তিতুমীর বলেন, "প্রতিটি এনজিও তাদের কর্মসূচির অংশ হিসেবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারে। প্রয়োজন হলে পুনঃঅর্থায়ন ও সহজ শর্তে অর্থায়নের নতুন উদ্যোগও নেওয়া হবে।"
তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, সরকার কেবল কর-প্রণোদনার ওপর নির্ভর না করে দীর্ঘমেয়াদী নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে এই খাতকে টেকসই করতে চায়।
সাবেক সরকারের জ্বালানি খাতের অব্যবস্থাপনার সমালোচনা করে উপদেষ্টা বলেন, বর্তমান সরকার জ্বালানি খাতে একটি "বিষাক্ত ব্যবস্থা" উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে। দীর্ঘ সময় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় দেশ এখন আমদানিনির্ভরতার চাপে রয়েছে। তবে তিনি বলেন, "আমরা অতীতের বিষাক্ত ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করতে চাই না; সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে চাই।"
বর্তমান বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমদানিনির্ভরতার বদলে স্বাবলম্বী জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি। সে লক্ষ্যে এনার্জি মিক্সে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়ানোর পাশাপাশি গৃহস্থালি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার সম্প্রসারণে নীতিগত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
পরিশেষে তিনি বলেন, এই লক্ষ্য অর্জনে শুধু সরকারের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। এনজিও, বাংলাদেশ ব্যাংক, কৃষি ব্যাংক, পল্লী বিদ্যুৎ এবং নাগরিক সমাজের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। উপজেলা ও গ্রাম পর্যায়ে জনসচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে একে জাতীয় আন্দোলনে রূপান্তর করতে পারলে বাংলাদেশ জ্বালানি নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়নে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।