ঢাকায় পরপর দুইবার “অনিবার্য কারণ” দেখিয়ে বাতিল করা হলো ভারতের সংগীতশিল্পী অনুপম রায়ের কনসার্ট। সর্বশেষ গত ২৯ জুলাই এক নোটিশে ১ আগস্ট অনুষ্ঠেয় ‘ওয়ান ট্রু কনসার্ট’-এর অনুমতি বাতিল করে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়। শেষ মুহূর্তের এমন সিদ্ধান্তে আয়োজক প্রতিষ্ঠানের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি টিকিট কাটা দর্শকের হতাশা ও ক্ষোভের কথাও শোনা যাচ্ছে। কাছাকাছি সময়ে পাকিস্তানি শিল্পী আতিফ আসলামের কনসার্ট নির্বিঘ্নে হলেও কেন অনুপম রায়ের ক্ষেত্রে আবারও “অনিবার্য কারণ” সামনে এসেছে—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ নানা মহলে এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

মুক্তকণ্ঠের খোঁজ অনুযায়ী, গত ২৪ জুলাই ঢাকার মাদানী অ্যাভিনিউয়ে অনুষ্ঠিত হয় পাকিস্তানি সংগীতশিল্পী আতিফ আসলামের কনসার্ট। প্রায় দুই হাজার আসনের ওই আয়োজনে ধারণক্ষমতার কয়েক গুণ দর্শক উপস্থিত ছিলেন বলে আয়োজক-সংক্রান্ত তথ্য থেকে জানা যায়। ঠিক এক সপ্তাহ পর, ১ আগস্ট ঢাকার বিমানবন্দরের ইউনাইটেড কনভেনশন সেন্টারে অনুপম রায়ের কনসার্ট হওয়ার কথা ছিল। আয়োজক প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, প্রস্তুতি এবং সরকারি অনুমতিও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অনুষ্ঠানের মাত্র দুই দিন আগে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় “অনিবার্য কারণ” উল্লেখ করে অনুমতি বাতিল করে।

এ নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বাতিল হলো অনুপম রায়ের কনসার্ট। একই কনসার্ট ২৬ জুন হওয়ার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে সেটিও বাতিল হয়। পরে ২০ জুলাই নতুন করে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অনুমতি পাওয়ার পর অনুষ্ঠানের নতুন তারিখ চূড়ান্ত হয় ১ আগস্ট। এরপর প্রচারণা চালানো হয় এবং টিকিট বিক্রি শুরু হয়। আয়োজকদের পরিকল্পনায় প্রথম দফায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বেঙ্গল সিম্ফনি ব্যান্ডের পারফর্ম করার কথা ছিল। তাদের অস্ট্রেলিয়া সফর থাকায় পরবর্তী সময়ে একই মঞ্চে পারফর্ম করার জন্য মাইলসের নাম চূড়ান্ত করা হয়।

আয়োজক প্রতিষ্ঠান ট্রিপল টাইম কমিউনিকেশন জানিয়েছে, ইউনাইটেড কনভেনশন সেন্টারের ধারণক্ষমতা আড়াই হাজার। এর মধ্যে এবার বিক্রি হয় ১ হাজার ৬০০ টিকিট। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয় ৪০০ সৌজন্য টিকিট, পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয় আরও ৫০০ টিকিট। প্রতিটি টিকিটের মূল্য ছিল আড়াই হাজার টাকা। আয়োজকদের দাবি, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কেও ২০টি সৌজন্য টিকিট দেওয়া হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রিতম দে জানান, কনসার্টে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী উপস্থিত থেকে অনুষ্ঠান উপভোগ করার আগ্রহও প্রকাশ করেছিলেন।

আর্থিক ক্ষতির বিষয়ে প্রিতম দে বলেন, শিল্পীর সম্মানী, ভেন্যু বুকিং, সাউন্ড, মার্কেটিং, হোটেল, বিমান টিকিটসহ প্রথম দফায় প্রায় ৫৫ লাখ এবং দ্বিতীয় দফায় আরও প্রায় ৩২ লাখ টাকা খরচ হয়। দুই দফা মিলিয়ে মোট ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৭ লাখ টাকায়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শিল্পীর সম্মানী বাবদ অনুপম রায়কে বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৪ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। এ সম্মানীর বিপরীতে ২৪ মে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে ৮ লাখ টাকা উৎসে করও পরিশোধ করা হয়েছে।

প্রিতম দে বলেন, ‘সব কাগজপত্র যাচাই-বাছাই শেষে ২০ জুলাই আমাদের অনুমতি দেওয়া হলো। কিন্তু, অনুষ্ঠানের দুই দিন আগে রাত নয়টার দিকে জানানো হলো, কনসার্ট করা যাবে না। শুধু বলা হয়েছে “অনিবার্য কারণ”। সেটি কী, আজও আমরা জানতে পারিনি। এতে আমরা শুধু আর্থিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হইনি, প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হয়েছে।’

প্রিতম আরও বলেন, ‘দুই দফায় ভেন্যু ভাড়া বাবদই ৩২ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। যদি সপ্তাহখানেক আগেও আমাদের বাতিলের সিদ্ধান্ত জানানো হতো, তাহলে অন্তত টাকাটা ফেরত পাওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে বাতিল হওয়ায় সেটিও সম্ভব হয়নি।’

অনুপম রায়ের কনসার্ট ঘিরে দর্শকদের আগ্রহ ছিল উল্লেখযোগ্য। ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, যশোর ও টাঙ্গাইল থেকে দর্শকেরা টিকিট কিনেছিলেন বলে জানিয়েছে আয়োজক প্রতিষ্ঠান। প্রিতম দে বলেন, ‘আগেরবারের মতো এবারও যাঁরা টিকিট কিনেছেন, তাঁদের টাকা ফেরত দেওয়া হবে। আগামীকাল সোমবার রিফান্ড কার্যক্রম শুরু হবে। তবে সরকার আন্তরিক হলে ভবিষ্যতে আমরা এ আয়োজন করতে চাই।’

পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে কনসার্ট উপভোগের জন্য আটটি টিকিট কিনেছিলেন উত্তরার বাসিন্দা মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা। আগের সপ্তাহে ছেলে ও তার বন্ধুদের জন্য আতিফ আসলামের কনসার্টের টিকিটও কেনেন বলেও জানান তিনি। তাঁর মতে, ‘মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে দুই দেশের শিল্পীর অনুষ্ঠান, একজন নির্বিঘ্নে অনুষ্ঠান করলেন, আরেকজনের অনুষ্ঠান ‘অনিবার্য কারণ’ দেখিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হলো। এটা মানুষের মনে প্রশ্ন তো তুলবেই।’

কনসার্টের নিয়মিত দর্শক সূচনা তাসনিমও তিনটি টিকিট কিনেছিলেন। তিনি বলেন, ‘অনেক দিন পর একটা কনসার্টে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটিও বাতিল হয়ে গেল।’

এই কনসার্টে পারফর্ম করার কথা ছিল দেশের জনপ্রিয় ব্যান্ড মাইলসের। ব্যান্ডের অন্যতম সদস্য হামিন আহমেদ শেষ মুহূর্তে অনুষ্ঠান বাতিলের সিদ্ধান্তকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ বলে মন্তব্য করেন।

গতকাল শনিবার বিকেলে হামিন আহমেদ বলেন, ‘শেষ মুহূর্তে এসে কনসার্ট বাতিল করাটা একেবারেই অনাকাঙ্ক্ষিত। এতে শুধু আয়োজক প্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, তাদের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হয়। ‘অনিবার্য কারণ’ উল্লেখ করেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট কারণ যদি থেকে থাকে, সেটিও স্পষ্টভাবে জানানো উচিত ছিল।’

সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানি শিল্পী আতিফ আসলামের কনসার্ট হলেও ভারতীয় শিল্পী অনুপম রায়ের অনুষ্ঠান বাতিল হওয়ায় যে প্রশ্ন উঠেছে—সে প্রসঙ্গেও কথা বলেন হামিন আহমেদ। তবে এ বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করতে চাননি তিনি। তাঁর মতে, ‘আমি ওই বিতর্কে যেতে চাই না। তবে সরকার যদি কনসার্ট বাতিলের কারণটি সুনির্দিষ্টভাবে ব্যাখ্যা করত, তাহলে এমন প্রশ্ন উঠত না। কাছাকাছি সময়ে একজন বিদেশি শিল্পীর কনসার্ট হয়েছে, আরেকজনের হয়নি, এমন পরিস্থিতিতে মানুষের মনে প্রশ্ন জাগাটা খুবই স্বাভাবিক।’

কলকাতা থেকে অনুপম রায়ের ব্যবস্থাপক রানা সিংহ রায় বলেন, ‘এ নিয়ে দ্বিতীয়বার কনসার্ট বাতিল হলো। প্রথমবার বাতিল হওয়ার পর নতুন তারিখ ঠিক করা হয়েছিল। ভিসা, টিকিটসহ সব প্রস্তুতি সম্পন্ন ছিল। কিন্তু দুই দিন আগে জানানো হলো যে অনুষ্ঠানের অনুমতি নেই। এর বাইরে আমাদের আর কিছু জানানো হয়নি।’

কনসার্ট বাতিলের নোটিশে স্বাক্ষর করেছেন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব মহুয়া আফরোজ। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা আসলে স্যাররা বলতে পারবেন। আমি আদিষ্ট হয়ে দিয়েছি। আমি জুনিয়র মোস্ট কর্মকর্তা; এসব ব্যাপারে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিব স্যাররা ভালো বলতে পারবেন।’ পরে এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে সংস্কৃতিমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয় এবং খুদে বার্তাও পাঠানো হয়। তবে গতকাল রাত আটটা পর্যন্ত তাঁদের কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।