ইট-সিমেন্টের প্রথাগত স্কুল ভবনের ধারণা ভেঙে প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে পাঠদানের এক অনন্য মডেল তৈরি করেছে পাবনার চাটমোহর উপজেলার কুমারগাড়া গ্রামের ‘বড়াল বিদ্যানিকেতন’। নদী, গাছপালা আর মুক্ত বাতাসের সান্নিধ্যে শিশুদের প্রকৃতিনির্ভর শিক্ষায় গড়ে তোলার এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মর্যাদাপূর্ণ ‘আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টস’ পুরস্কার অর্জন করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
২০১৯ সালের জানুয়ারিতে নিজস্ব অর্থায়নে ও জমিতে মিজানুর রহমান ও দিল আফরোজ দম্পতি এই বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন। বড়াল নদীর তীরে পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের তাড়না থেকেই এই বিশেষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেন তারা। বর্তমানে এখানে প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ৪৫০ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে এবং নিয়োজিত আছেন ২৫ জন শিক্ষক।
বিখ্যাত স্থপতি ও পরিবেশবিদ ইকবাল হাবিবের নকশায় নির্মিত এই ক্যাম্পাসে ইট-কংক্রিটের আধিপত্য নেই বললেই চলে। প্রতিটি স্থাপনা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যেন শিক্ষার্থীরা প্রকৃতির কাছাকাছি থেকে শিখতে পারে। পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি এখানে নাচ, গান, আবৃত্তি, ছবি আঁকা, খেলাধুলা ও প্রযুক্তির শিক্ষা দেওয়া হয়। প্রাঙ্গণের আম-লিচু পেকে গেলে শিক্ষকরা তা সংগ্রহ করে শিক্ষার্থীদের মাঝে বিলিয়ে দেন। এছাড়া এখানে রয়েছে সমৃদ্ধ লাইব্রেরি এবং স্বল্পমূল্যে শিক্ষা উপকরণের ব্যবস্থা।
নান্দনিকতা, পরিবেশবান্ধব চিন্তা এবং বুদ্ধিদীপ্ত স্থাপত্য পরিকল্পনার কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বীকৃতি পেয়েছে এই বিদ্যালয়টি। শিক্ষার্থীদের মতে, তাদের স্কুলটি সাধারণ বিদ্যালয়ের চেয়ে আলাদা। খোলামেলা পরিবেশে নানা প্রজাতির ফুল, ফল ও বনজ গাছের উপস্থিতিতে পড়াশোনার পরিবেশ হয়ে উঠেছে মনোরম। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এই প্রতিষ্ঠানটি দেখতে আসেন। তারা আরও জানান, নৈতিকতা ও সৃজনশীলতার ওপর জোর দেওয়ায় এখানে গাইড বইয়ের প্রয়োজন হয় না এবং শিক্ষকদের আন্তরিকতায় তারা নিয়মিত ভালো ফলাফল করছে।
বিদ্যালয়টির নকশাকার স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, “পরিবেশ আন্দোলনের কাজের সূত্রে একসময় চাটমোহরে গিয়েছিলাম। তখন জানতে পারি, আমার সহকর্মী মিজানুর রহমান প্রত্যন্ত গ্রামে একটি স্কুল গড়ে তুলছেন। পরিদর্শনে গিয়ে দেখি, তীব্র গরমের মধ্যে টিনের ঘরে শিশুরা ক্লাস করছে। সীমিত অবকাঠামো থাকলেও শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টদের আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি ছিল না। দৃশ্যটি আমাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। এরপর থেকেই বিদ্যালয়টির সঙ্গে যুক্ত হই। শুরু থেকেই ভাবনা ছিল ব্যতিক্রমী নকশায় এমন একটি স্কুল গড়ে তোলা, যা অন্যদের জন্যও দৃষ্টান্ত হয়ে উঠবে। আজকের এই রূপ সেই ভাবনারই বাস্তব প্রতিফলন।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, “বিদ্যালয়টি করতে খুব বেশি ব্যয় হয়নি। আন্তরিকতা ও সৃজনশীল পরিকল্পনা থাকলে সীমিত অর্থ দিয়েও দৃষ্টিনন্দন, পরিবেশবান্ধব ও কার্যকর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ করা সম্ভব। বড়াল বিদ্যানিকেতন তারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ। সরকারি বিদ্যালয় নির্মাণে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়, তার তুলনায় অনেক কম খরচে এমন মানসম্পন্ন ও নান্দনিক স্থাপনা গড়ে তোলা সম্ভব।”
প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, “আমাদের কাছে শিক্ষা মানে শুধু পাঠ্যবই মুখস্থ করে পরীক্ষায় ভালো ফল করা নয়। আমরা চাই, শিশুরা প্রকৃতির প্রতি মমত্ববোধ, মানবিক মূল্যবোধ, সৃজনশীল চিন্তা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ নিয়ে বেড়ে উঠুক। সেই লক্ষ্য থেকেই বিদ্যালয়টি প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গড়ে তোলা হয়েছে। এখানে শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালের বাইরেও শেখার সুযোগ রয়েছে। গাছপালা, নদী, খোলা মাঠ, পাখির ডাক আর ঋতুর পরিবর্তন—সবকিছুই শিশুদের শেখার উপকরণ।”
তিনি আরও বলেন, “শৈশবেই যদি শিশুদের প্রকৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া যায়, তবে তারা পরিবেশ রক্ষার গুরুত্ব বুঝবে এবং ভবিষ্যতে দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে। আমরা বিশ্বাস করি, একটি সুন্দর সমাজ গড়তে শুধু মেধাবী নয়, মানবিক ও সচেতন মানুষ প্রয়োজন। সেই মানুষ গড়ার ছোট্ট প্রয়াসই বড়াল বিদ্যানিকেতন। এখানে শিশুরা প্রতিযোগিতার চেয়ে সহযোগিতা, মুখস্থ বিদ্যার চেয়ে বোঝার আনন্দ এবং প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের শিক্ষা বেশি পায়।”
প্রধান শিক্ষক দিল আফরোজ বেগম বলেন, “আমাদের এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষায় পিছিয়ে ছিল। একজন শিক্ষিত মানুষ হিসেবে সব সময়ই ভেবেছি, কীভাবে এই প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের মধ্যে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ তৈরি করা যায়। এখানকার অনেকের চিন্তাভাবনা এখনো সনাতনী। সেই বাস্তবতা বদলানোর স্বপ্ন থেকেই এই উদ্যোগ।”
তিনি আরও বলেন, “অনেক দিন ধরে ভাবছিলাম, কীভাবে শিশুদের বিদ্যালয়মুখী করা যায়। তখনই মনে হলো, শুধু পাঠদান নয়, বিদ্যালয়ের পরিবেশও আকর্ষণীয় হতে হবে। তাই প্রচলিত ধারা থেকে বেরিয়ে প্রকৃতিবান্ধব অবকাঠামো, খোলামেলা পরিবেশ ও নিজস্ব পাঠ্যক্রমের সমন্বয়ে এটি গড়ে তুলেছি। এখানে শিশুরা প্রকৃতির সান্নিধ্যে আনন্দের সঙ্গে শেখার সুযোগ পায়। আমি বিশ্বাস করি, শিক্ষা মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে। আমার স্বপ্ন, এই অবহেলিত গ্রামীণ জনপদ একদিন শিক্ষার আলোয় আলোকিত হবে। এই বিদ্যালয় সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের একটি দৃঢ় পদক্ষেপ।”
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আশরাফুল কবীর বলেন, “শিশুদের জন্য আনন্দময় ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে শেখার আগ্রহ বহুলাংশে বেড়ে যায়। বড়াল বিদ্যানিকেতনের এই উদ্যোগটি অন্যদের জন্যও অনুকরণীয় ও অনুপ্রেরণাদায়ক হতে পারে।”