বান্দরবানে এখন আর টানা বা ভারী বর্ষণের প্রয়োজন পড়ে না; অল্প সময়ের বৃষ্টিতেই প্লাবিত হচ্ছে জেলার নিম্নাঞ্চল। বিশেষ করে সাঙ্গু নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় পৌরসভার বিভিন্ন এলাকা ও আশপাশের জনপদ তলিয়ে গিয়ে সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র জলাবদ্ধতা। দীর্ঘদিন ধরে সাঙ্গু নদী ও সংযুক্ত খালগুলো খনন না করা এবং কার্যকর সংস্কারের অভাবে নদীর নাব্যতা তলানিতে ঠেকেছে। ফলে প্রতি বর্ষাতেই চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ১৯৮১ সালে বান্দরবান জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর থেকে সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর টেকসই উন্নয়ন, নাব্যতা রক্ষা বা ভাঙন প্রতিরোধে বড় কোনো প্রকল্প নেওয়া হয়নি। বছরের পর বছর পলি জমে নদী ভরাট হয়েছে, ফলে স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর সঙ্গে অবৈধ দখল ও খাল ভরাট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. আবদুল করিম আক্ষেপ করে বলেন, “আগে পরিস্থিতি এমন ছিল না। এখন কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই ঘরে পানি ঢুকে যায়, নামতেও অনেক সময় নেয়। নদীর গভীরতা না থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই পানি উপচে পড়ছে।”
একই ভোগান্তির কথা জানান কালাঘাটার গৃহিণী রোজিনা বেগম। তিনি বলেন, “প্রতি বর্ষায় আতঙ্কে দিন কাটে। আসবাবপত্র ও গৃহস্থালি জিনিস বারবার নষ্ট হচ্ছে। স্থায়ী সমাধান না হলে এই দুর্ভোগ কমবে না।”
কালাঘাটার ব্যবসায়ী মো. সোহেল রানার মতে, শুধু ত্রাণ দিয়ে সাময়িক উপশম মিলবে না। নদী-খাল খনন ও অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।
সমস্যার কথা স্বীকার করে বান্দরবান পৌরসভার প্রশাসক এসএম মনজুরুল হক মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “সাঙ্গু নদী দিন দিন ভরাট হয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে পৌর এলাকার বেশ কয়েকটি খালও আগের মতো পানি ধারণ করতে পারছে না। এ সমস্যার সমাধানে আমরা ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি। জাইকার সহায়তায় বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে নদী ও খাল সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা চলছে। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরের সমন্বয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে জনগণকে বারবার একই দুর্ভোগে পড়তে না হয়।”
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী অপু দেব মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “সাঙ্গু নদী এবং মেক্সিখালের বিভিন্ন অংশ অবৈধভাবে দখল ও ভরাট হওয়ার কারণে পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। এটিও জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ। এছাড়া চলতি বছর ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় ৫১৮ মিলিমিটার বেশি সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।”
তিনি আরও বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর কোনো বড়ো ধরনের সংস্কার হয়নি। আমরা একটি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করছি, যেখানে নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে ড্রেজিং, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ভাঙন প্রতিরোধ, প্রয়োজনীয় স্থানে ব্লক স্থাপনসহ বিভিন্ন কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত থাকবে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, বান্দরবানের এই তীব্র জলাবদ্ধতা ও বন্যা মোকাবিলায় সাময়িক পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। নদী ও খালের নাব্যতা পুনরুদ্ধার, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, নিয়মিত ড্রেজিং, টেকসই ভাঙন প্রতিরোধ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর আন্তঃসমন্বয়ই হতে পারে বান্দরবানবাসীর এই দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের স্থায়ী সমাধান।