দীর্ঘ ৬৮ বছরের রাষ্ট্রহীন ও অবরুদ্ধ জীবনের অবসান ঘটিয়ে স্বাধীন নাগরিকত্বের স্বাদ পেয়েছেন বিলুপ্ত ছিটমহলবাসী। ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্যরাতে (১ আগস্টের প্রথম প্রহরে) বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ঐতিহাসিক ছিটমহল বিনিময় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। শনিবার (১ আগস্ট) সেই মুক্তির ১১ বছর পূর্ণ হলো।

এই ভূমি সীমান্ত চুক্তির ফলে দুই দেশের অভ্যন্তরে থাকা ১৬২টি ছিটমহলের প্রায় ৫৪ হাজার মানুষ মুক্তি পান। চুক্তি অনুযায়ী, ভারতের অভ্যন্তরে থাকা ১১১টি ছিটমহল ১৭ হাজার ২৫৮ একর জমিসহ বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত হয়। অন্যদিকে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা ৫১টি ছিটমহল ৭ হাজার ১১০ একর জমিসহ ভারতের সঙ্গে যুক্ত হয়। এর ফলে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ বাংলাদেশে এবং প্রায় ১৪ হাজার মানুষ ভারতে নিজ নিজ দেশের পূর্ণাঙ্গ নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পান।

নাগরিকত্বের স্বীকৃতি পাওয়ার পাশাপাশি ভোটাধিকার, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক সেবা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হলেও অনেক বাসিন্দার প্রত্যাশা এখনও অপূর্ণ। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা ১১১টি বিলুপ্ত ছিটমহলের মধ্যে কুড়িগ্রামে ১২টি, লালমনিরহাটে ৫৯টি, পঞ্চগড়ে ৩৬টি এবং নীলফামারীতে ৪টি অবস্থিত।

লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলার বিলুপ্ত ছিটমহলবাসীদের সঙ্গে কথা বলে মুক্তকণ্ঠ জানতে পেরেছে, সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও স্বাস্থ্যসেবায় উন্নতি হলেও কর্মসংস্থান ও বাজার অবকাঠামোতে এখনও ঘাটতি রয়েছে। বেকারত্ব দূর করতে নির্মিত আইসিটি ভবনটি দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর হয়ে পড়ে আছে। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী শিল্পায়ন বা কর্মসংস্থানের সুযোগ না আসায় অনেক তরুণ এখনও বেকার।

কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার দাসিয়ারছড়া জনপদে বর্তমানে প্রায় সাত হাজার মানুষের বসবাস, যা দেশের সবচেয়ে বড় বিলুপ্ত ছিটমহল। এলাকাটি বর্তমানে তিনটি ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত। তবে স্থানীয়রা দাসিয়ারছড়াকে পৃথক ইউনিয়ন ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন।

দাসিয়ারছড়া ছিটমহলের বাসিন্দা হাফিজুর রহমান বলেন, “আমরা মোটামুটি সব পেয়েছি। এখন আমাদের সবার দাবি দাসিয়ারছড়াকে ইউনিয়ন ঘোষণা করা হোক, এটা হলে আর সরকারের কাছে চাওয়া পাওয়া নেই।”

বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা বলেন, “নাগরিকত্ব পাওয়ার মাধ্যমে আমাদের দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রহীন জীবনের অবসান হয়েছে। কিন্তু উন্নয়নের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার অনেকটাই এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। দাসিয়ারছড়াকে পৃথক ইউনিয়ন ঘোষণা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা এখন সময়ের দাবি।”

এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ বলেন, “বিলুপ্ত ছিটমহলবাসীর জীবনমান উন্নয়নে বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। শিক্ষা, অবকাঠামো ও সামাজিক উন্নয়নের পাশাপাশি ভবিষ্যতেও তাদের পাশে থেকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।”

এদিকে, মুক্তির এই দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে লালমনিরহাটের বিলুপ্ত ছিটমহলগুলোতে ‘ছিটমহল দিবস’ পালিত হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের কোনো আনুষ্ঠানিক আয়োজন না থাকলেও মোমবাতি প্রজ্বালন ও আতশবাজির মাধ্যমে উৎসব পালন করছেন বাসিন্দারা।

পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রামের বাসিন্দা মফিজুল ইসলাম বলেন, “৬৮ বছর আমাদের কোনো দেশের পরিচয় ছিল না। অসুস্থ হলে হাসপাতালে ভুয়া নাম দিয়ে ভর্তি হতে হতো। আজ ১১ বছর ধরে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক। বিদ্যুৎ এসেছে, পাকা রাস্তা হয়েছে। শান্তিতে ঘুমাতে পারি, এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় পাওয়া।”

হাতীবান্ধা উপজেলার গোতামারী এলাকার লাইলী বেগম বলেন, “আগে সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধায় আমাদের অধিকার ছিল না। আজ আমার সন্তানরা নিজেদের পরিচয়ে স্কুলে যাচ্ছে। ঘরের কাছেই ক্লিনিক পেয়েছি, সরকার থেকে ভাতা পাচ্ছি। আমাদের জীবন পুরোপুরি বদলে গেছে।”

দহগ্রামের রমেশ চন্দ্র বলেন, “আমাদের পরিচিত অনেকেই ভারতে গেছেন। সেখানে তারা পুনর্বাসিত হয়েছেন ঠিকই, কিন্তু ইন্টারনেটে কথা হলে বলেন—ভিটেমাটির টানের কোনো বিকল্প নেই। আমরা আমাদের নিজ দেশে অনেক শান্তিতে আছি।”

লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) রাশেদুল হক প্রধান বলেন, “বিলুপ্ত ছিটমহলের মানুষের এই দিনে শুধু বন্দিদশা থেখে মুক্তি মেলেনি। তারা পেয়েছে নতুন ঠিকানা। জেলা প্রসাশনের পক্ষ থেকে সব সময় তাদের বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়।”