হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার বাউশা ইউনিয়নের পাইকপাড়া গ্রামের ১৯ বছর বয়সী মো. আলিফ মিয়া চৌধুরীর জীবন এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে। গত ২৮ জুলাই হবিগঞ্জ শহরে রাজনৈতিক সংঘর্ষে গুরুতর আহত হয়ে তিনি বাম চোখের দৃষ্টিশক্তি স্থায়ীভাবে হারিয়েছেন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, বাম চোখের দৃষ্টিশক্তি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে এবং ডান চোখ দিয়েও তিনি ঝাপসা দেখছেন। বর্তমানে ঢাকার জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে তার চিকিৎসা চলছে।
নবীগঞ্জ হোমল্যান্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী আলিফ জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ছাত্র সংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তির নবীগঞ্জ উপজেলা শাখার সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক। পারিবারিক প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে তিনি হয়ে উঠেছিলেন পরিবারের প্রধান ভরসা। সড়ক দুর্ঘটনায় শয্যাশায়ী বাবা আব্দুর শহীদ চৌধুরী এবং দীর্ঘদিনের অসুস্থ ও মানসিক ভারসাম্যহীন মা আতিকা বেগমের পাশাপাশি বেকার বড় ভাই আতিক চৌধুরীর সংসারে নিয়মিত আয়ের কোনো উৎস ছিল না। পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করে অর্জিত অর্থ দিয়ে আলিফ পরিবারের ভরণপোষণ চালাতেন।
প্রতিবেশী শিব্বির আহমদ বলেন, "যে ছেলে নিজের পড়াশোনা চালিয়ে টিউশনি করে অসুস্থ বাবা-মায়ের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল, এখন সেই ছেলেই চিকিৎসা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। একদিকে চিকিৎসার খরচ, অন্যদিকে পরিবারের আয়ের পথ বন্ধ। পরিবারটি এখন চরম দুশ্চিন্তায় পড়বে।"
বাউশা ইউনিয়ন পরিষদের নারী সদস্য মরিয়ম বেগম জানান, আলিফের পরিবারের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। তার বাবা পঙ্গু হওয়ায় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে প্রতিবন্ধী ভাতা দেওয়া হয় এবং আত্মীয়দের সহযোগিতায় কোনোমতে সংসার চলে। এই দুর্ঘটনায় পরিবারটি আরও অসহায় হয়ে পড়বে বলে তিনি মনে করেন।
ঘটনার সূত্রপাত গত ২৮ জুলাই এনসিপির কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে আয়োজিত ‘জুলাই জাগরণ পদযাত্রা’কে কেন্দ্র করে। আজমিরীগঞ্জ ও জেলা সদরে এই কর্মসূচি চলাকালে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে উত্তেজনা তৈরি হয়। জেলা সদরে কর্মসূচি শেষে ফেরার পথে হবিগঞ্জ শহরের কোর্ট মসজিদ এলাকায় এনসিপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ ঘটে। এতে এনসিপির মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলমসহ অন্তত ১০ জন আহত হন এবং ওই সংঘর্ষের সময় বাম চোখে তীব্র আঘাত পান আলিফ।
আলিফের বড় ভাই আতিক চৌধুরী বলেন, "আলিফের চোখের অবস্থা ভালো না। ডান চোখ দিয়ে ঝাপসা দেখে। সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তা হচ্ছে ওর ভবিষ্যৎ নিয়ে। মামলা হয়েছে, কিন্তু এখনও কোনো আসামি গ্রেপ্তার হয়নি।"
আলিফের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নবীগঞ্জ হোমল্যান্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সৈয়দ আবু তাহের জানান, এসএসসিতে ভালো ফল করা আলিফের পরিবারের আর্থিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় কলেজ কর্তৃপক্ষ তার পড়াশোনার সব ব্যয় বহন করছে। তিনি বলেন, "তার এই দুর্ঘটনায় আমরা কলেজ কর্তৃপক্ষ খুবই মর্মাহত। যেহেতু রাজনৈতিক একটি কর্মসূচিতে গিয়ে এমন ঘটনা ঘটেছে, তাই প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে অনেক কিছু করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে আলিফ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসুক। এটাই আমাদের কামনা।"
জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) নাহিদ উদ্দিন তারেক জানান, এনসিপি আলিফের চিকিৎসার ব্যয় বহন করছে এবং নেতাকর্মীরা তার পাশে রয়েছেন। তবে দায়ীদের গ্রেপ্তার না হওয়ায় তারা উদ্বিগ্ন।
সংঘর্ষের পর জেলা প্রশাসন পৌর এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে। এই ঘটনায় জাতীয় যুবশক্তি হবিগঞ্জ জেলার আহ্বায়ক তন্ময় তাহের রুবেল বাদী হয়ে জেলা ছাত্রদলের সভাপতি শাহ রাজিব আহমেদ রিংগনসহ ১১ জনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও ১০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। অন্যদিকে, জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ইকবাল হোসেন রুকন বাদী হয়ে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারী ও সারজিস আলমসহ ১০ জনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৪০ থেকে ৫০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন।
হবিগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুল হক বলেন, "এনসিপির পক্ষ থেকে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং ছাত্রদলের পক্ষ থেকেও একটি অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। উভয় বিষয় গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করছে পুলিশ।"