একসময় ঢাকাই চলচ্চিত্রে তাঁর উপস্থিতি মানেই ছিল নায়ক-খলনায়কের টানটান লড়াই। মার্শাল আর্টনির্ভর অ্যাকশন দৃশ্যে ‘ইলিয়াস কোবরা’ নামটি দর্শকের কাছে পরিচিত ছিল। তবে আলোঝলমলে সেই জীবন এখন অতীত। কয়েক বছর ধরে তিনি কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের নোয়াখালীয়াপাড়ায় বসবাস করছেন।
গ্রামের জীবনকে ঘিরে তাঁর সময় কাটে মসজিদে ইবাদত, কৃষিকাজ, গরু-ছাগলের খামার দেখাশোনা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে। স্থানীয় লোকজন তাঁকে সম্মান জানিয়ে ১১ বছর আগে প্রতিষ্ঠা করেন ‘ইলিয়াস কোবরা বাজার’।
গত বৃহস্পতিবার বিকেলে নোয়াখালীয়াপাড়ার ‘ইলিয়াস কোবরা বাজার’-এর একটি দোকানে বসে ইলিয়াস কোবরার সঙ্গে কথা হয়। চার দশকের চলচ্চিত্রজীবন, গ্রামে ফেরা, নিজের নামে বাজার প্রতিষ্ঠা এবং বর্তমান জীবন—সব মিলিয়ে নানা দিক তুলে ধরেন তিনি।
ইলিয়াস কোবরা বলেন, ‘৪০ বছর সিনেমা করেছি। পাঁচ শতাধিক ছবিতে অভিনয় করেছি। এখন আর সেই জীবনে ফিরতে চাই না। বাকি সময়টা গ্রামেই থাকতে চাই। কৃষিকাজ, ইবাদত আর মানুষের জন্য কিছু করতে পারলে সেটাই আমার শান্তি।’
নিজের নামে বাজার
বাহারছড়ার পাকা সড়কের দুই পাশে গড়ে উঠেছে ‘ইলিয়াস কোবরা বাজার’। বর্তমানে সেখানে প্রায় ৪৫টি দোকান। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত মাছ, শাকসবজি, পান-সুপারি, নারকেল ও মৌসুমি ফল বিক্রি হয়।
স্থানীয় দোকানি নুরুল ইসলাম বলেন, একসময় এই এলাকার মানুষকে কেনাকাটা কিংবা কৃষিপণ্য বিক্রির জন্য প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে টেকনাফ সদরে যেতে হতো। বাজারটি হওয়ার পর সেই দুর্ভোগ কমেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে অপহরণ ও মানব পাচারের ঘটনার কারণে ক্রেতা কমে গেছে।
বাজারের নামকরণের পেছনের ঘটনা জানতে চাইলে ইলিয়াস কোবরা বলেন, ‘গ্রামের নাম “নোয়াখালী” বা “নোয়াখালীয়াপাড়া” হওয়ায় অনেকেই বিভ্রান্ত হতেন। ২০১৫ সালে গ্রামে এলে স্থানীয় লোকজন তাঁর কাছে বাজারের নাম ‘ইলিয়াস কোবরা বাজার’ রাখার অনুমতি চান। তাঁদের আগ্রহ দেখে না করলাম না। আমার উপস্থিতিতে তাঁরা একটি সাইনবোর্ড তুলে দিলেন। সেই থেকে বাজারের নামকরণ “ইলিয়াস কোবরা বাজার” হয়ে গেল। প্রথমে একটা মুদিদোকান দিয়ে শুরু, এখন দোকান হয়েছে ৪৫টির বেশি। বাইরের লোকজন শতবর্ষী গর্জনবন, পাহাড়-ঝরনা দেখতে এসে “ইলিয়াস কোবরা বাজার” দেখে থমকে দাঁড়ান, বাজার থেকে গাছে পাকা ফলমুল কিনে নেন। বাজার হওয়ায় অনেকে সুফল ভোগ করছেন।’
অপহরণ-মানব পাচার ঠেকাতে উদ্যোগ
চলচ্চিত্র থেকে দূরে সরে এলেও নতুন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন ইলিয়াস কোবরা। বাহারছড়া ইউনিয়নের পাহাড়ঘেঁষা এলাকায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় ও মানব পাচারের ঘটনা বেড়েছে।
বাজারে দেখা হওয়ার সময়ও তিনি কয়েকজন গ্রামবাসীর সঙ্গে এসব বিষয় নিয়ে আলাপ করছিলেন।
ইলিয়াস কোবরা বলেন, ‘দু-এক দিন পরপর পাহাড় থেকে এসে সন্ত্রাসীরা মানুষ তুলে নিয়ে যায়। কয়েক দিন আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায় করে। এটা গ্রামের মানুষের জন্য বড় আতঙ্ক।’
ইলিয়াস কোবরা জানান, পরিস্থিতি মোকাবিলায় গ্রামের মানুষকে চারটি দলে ভাগ করা হয়েছে। প্রায় ১০০ জন স্বেচ্ছাসেবক পালাক্রমে গ্রাম পাহারা দেন। এতে অপহরণের ঘটনা কিছুটা কমেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরও সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে।
রুপালি পর্দায় চার দশক
ইলিয়াস কোবরার জন্ম ১৯৬১ সালের ২০ জানুয়ারি টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের নোয়াখালীয়াপাড়ায়। তাঁর পুরো নাম মোহাম্মদ ইলিয়াস। চলচ্চিত্রে আসার আগে তিনি মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। টেকনাফ, কক্সবাজার ও ঢাকায় তিনি প্রশিক্ষণকেন্দ্র পরিচালনা করেছেন।
১৯৮৭ সালে চিত্রনায়ক ও পরিচালক সোহেল রানা পরিচালিত ‘মারুফ শাহ’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হয় তাঁর। এরপর প্রায় চার দশকে পাঁচ শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। নব্বইয়ের দশকে মার্শাল আর্টনির্ভর অ্যাকশন সিনেমায় রুবেল, রতন তালুকদারসহ অনেক নায়কের বিপরীতে খলচরিত্রে জনপ্রিয়তা পান তিনি।
অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি ‘ভাইয়া নাম্বার ওয়ান’ চলচ্চিত্র প্রযোজনা করেন। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। সর্বশেষ শিল্পী সমিতির নির্বাচনে সহসভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন।
গ্রামেই কাটাতে চান বাকি জীবন
চলচ্চিত্র থেকে দূরে সরে এখন তাঁর দিন কাটে কৃষিকাজ, গরু-ছাগলের খামার, মসজিদ পরিচালনা এবং সামাজিক কর্মকাণ্ড নিয়ে। তিনি স্থানীয় সাগরপাড় জামে মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতিও। তাঁর উদ্যোগে মসজিদ পুনর্নির্মাণ, কবরস্থান সম্প্রসারণ এবং একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য জমি কেনা হয়েছে।
গ্রামে এখন তিনি মা, স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে থাকেন। তবে স্ত্রী ও সন্তানেরা ঢাকা ও টেকনাফ আসা-যাওয়ার মধ্যে থাকেন।
ইলিয়াস কোবরা বলেন, ‘গ্রামের প্রতি টান সব সময়ই ছিল। সিনেমার ব্যস্ততার মধ্যেও সুযোগ পেলেই চলে আসতাম। এখন স্থায়ীভাবে আছি। মানুষের কথা শুনি, সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করি। আমার দ্বারা যদি কারও উপকার হয়, সেটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।’
দুপুর গড়িয়ে বিকেলের আলো ম্লান হতে থাকলে বাজারের দোকানপাটে ক্রেতাদের আনাগোনা চোখে পড়ে। কথোপকথন শেষে তিনি মসজিদের দিকে হাঁটতে থাকেন। রুপালি পর্দায় ভয়ংকর খলচরিত্রে পরিচিত মানুষটি এখন পরিচিত তাঁর গ্রামের একজন সমাজসেবী এবং ধর্মচর্চায় নিবেদিত মানুষ হিসেবে।