ময়মনসিংহে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের কার্যালয়ে সরকারি জমিতে ব্যক্তিগত চাষাবাদ এবং গোপনীয় নথিতে স্বাক্ষর জালিয়াতির মতো গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ঊর্ধ্বতন মহলের নজরে এলেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

তথ্য অনুযায়ী, তিতাস গ্যাস কার্যালয়ের ১৩ একর সরকারি সম্পত্তির মধ্যে প্রায় এক একর জমিতে ধান, সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি পুকুরে মাছ চাষ করা হচ্ছে। এসব কাজে তিতাসের অফিস সহায়ক মনির, বাগানের মালি সেলিম ও উজ্জ্বল সরাসরি যুক্ত বলে জানা গেছে। এই কার্যক্রমগুলো প্রতিষ্ঠানের কোনো অনুমোদিত প্রকল্প, ইজারা বা উন্মুক্ত নিলামের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে না। ফলে সরকারি সম্পত্তি ব্যবহার করে অর্জিত আর্থিক সুবিধা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা না হয়ে ব্যক্তিগত পকেটে যাচ্ছে। উৎপাদিত এসব মাছ ও সবজির একটি অংশ কার্যালয়ের কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তার কাছেও পৌঁছায় বলে গুঞ্জন রয়েছে।

এই বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয় কৃষক মো. হাসান বলেন, "আমাদের জমি অধিগ্রহণের সময় আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল যে কার্যালয়ের সীমানার ভেতরে অব্যবহৃত পড়ে থাকা জমি আমরা কৃষিকাজের জন্য ব্যবহার করতে পারব। অথচ এখন আমাদের ফসল ফলাতে দেওয়া হয় না। তিতাস কার্যালয়ের কর্মচারীরা একা একা প্রায় এক একর জমিতে ধান ও সবজি চাষ করে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হচ্ছেন। সেখানে প্রতি মৌসুমে কমপক্ষে ২০০ মণ ধান উৎপাদিত হয়, সাথে চলে পুকুরে মাছ চাষ।"

সরকারি জমি ব্যক্তিগত ব্যবহারের বিষয়ে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন ময়মনসিংহের উপ-মহাব্যবস্থাপক (আঞ্চলিক বিক্রয় বিভাগ) প্রকৌশলী মো. শেখ মনজুর আহমেদ বলেন, "অনেকটা জায়গা এমনিতেই অনাবাদি পড়ে ছিল, তাই আমাদের কর্মচারীরা সেখানে ধান ও সবজি চাষ করছেন। পুকুরেও মাছ রয়েছে। তবে উৎপাদিত ফসলের কোনো অংশ আমাদের কোনো কর্মকর্তা নেন না।"

অন্যদিকে, তিতাস কার্যালয় থেকে গোপনে সরকারি ফাইল বাইরে নিয়ে গিয়ে তাতে নতুন শর্ত যুক্ত করার অভিযোগ উঠেছে। নগরীর ব্রাহ্মপল্লী এলাকার বাসিন্দা দুই ভাই আনোয়ার ও দেলোয়ারের গ্যাস সংযোগ সংক্রান্ত নথিতে এই অনিয়ম পরিলক্ষিত হয়েছে। আনোয়ারের স্ত্রী জহুরা খাতুনের ভাষ্যমতে, তিনি এককভাবে স্বামীর নামে থাকা রাইজারের গ্যাস ব্যবহার করতে চাইলেও পুরোনো ফাইলে ভিন্ন তথ্য দেখতে পান। সেখানে উল্লেখ রয়েছে—দুই ভাই আজীবন গ্যাস ব্যবহার করবেন এবং রাইজারের মালিক এ বিষয়ে কোনো আপত্তি করতে পারবেন না।

জহুরা খাতুনের দাবি, "তারা কখনোই এমন কোনো শর্তে সম্মতি দেননি। দেলোয়ার এবং তিতাস কার্যালয়ের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে পরবর্তীতে মূল নথিতে নতুন এই শর্ত সংযোজন করেছেন।"

সরেজমিনে নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সরকারি খাতায় হাতে লেখা কিছু অংশ সংযুক্ত করা হয়েছে এবং সেখানে দেলোয়ারের নতুন স্বাক্ষর রয়েছে। এ বিষয়ে দেলোয়ারের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে কার্যালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, দেলোয়ারকে ডেকে এনে উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা করা হবে এবং স্বাক্ষর যুক্ত করার ঘটনাটি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, এক ঠিকাদার ফাইলটি বাইরে নিয়ে গিয়েছিলেন, যার মাধ্যমে ওই লেখা ও স্বাক্ষর সংযুক্ত হতে পারে।

এই প্রসঙ্গে মো. শেখ মনজুর আহমেদ বলেন, "সরকারি নথিপত্রে অনুমতি ছাড়া নতুন কিছু সংযোজন বা স্বাক্ষর করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"

এর পাশাপাশি ময়মনসিংহ ও আশপাশের অঞ্চলে অবৈধ গ্যাস সংযোগ প্রদানকারী একটি শক্তিশালী চক্রের সক্রিয়তার কথা জানা গেছে। গত বছরের ২৬ অক্টোবর ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চর রঘুরামপুর থেকে নেত্রকোনাগামী সঞ্চালন পাইপলাইনের শম্ভুগঞ্জ এলাকায় একটি অবৈধ চুনা কারখানায় সংযোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে দুটি সার্ভিস লাইন স্থাপনের সময় বিপজ্জনক গ্যাস লিকেজের ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে তিতাস কর্তৃপক্ষ ও পুলিশের যৌথ অভিযানে ১৫ জনকে আটক করে মামলা করা হয়। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, মূল অপরাধীরা আগেই পালিয়ে যাওয়ায় তারা এখনও পর্দার আড়ালে এই বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে।

অবৈধ সংযোগ প্রসঙ্গে তিতাস গ্যাস ময়মনসিংহের উপ-মহাব্যবস্থাপক (আঞ্চলিক প্রশাসন ও লিগ্যাল বিভাগ) সাধনানন্দ রায় বলেন, "অবৈধ গ্যাস সংযোগ উচ্ছেদে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছি। যেকোনো ধরনের অপরাধের সাথে তিতাসের কেউ জড়িত থাকলেও তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।"

পুরো পরিস্থিতি নিয়ে ‘ময়মনসিংহ মঞ্চ’-এর সমন্বয়কারী ইমতিয়াজ আহমেদ তানসেন বলেন, "সরকারি সম্পত্তির ব্যক্তিগত ব্যবহার, গুরুত্বপূর্ণ নথি জালিয়াতির অভিযোগ এবং নিরাপত্তার দুর্বলতা—সব মিলিয়ে ময়মনসিংহ তিতাস গ্যাসের সার্বিক কার্যক্রম নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক। এসব অনিয়মের নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের চিহ্নিত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি অবৈধ সংযোগ প্রদানকারী সিন্ডিকেটের মূল হোতাদেরও দ্রুত গ্রেপ্তার করা উচিত।"