চীনের সাংহাইয়ে অনুষ্ঠিত ৬৭তম আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ। এবার অংশগ্রহণকারী ছয়জন প্রতিযোগীর প্রত্যেকেই পদক জিতেছেন, যা দেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক অর্জন। বাংলাদেশ দল মোট ১২১ নম্বর পেয়েছে, যা এই প্রতিযোগিতায় এখন পর্যন্ত দেশের সর্বোচ্চ দলীয় স্কোর। ১টি রৌপ্য ও ৫টি ব্রোঞ্জপদক জয়ের মাধ্যমে ১১৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ৩৯তম স্থান অধিকার করেছে।
এই গৌরবময় অর্জনের স্বীকৃতিস্বরূপ আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর গ্রিন রোডে ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক মিলনায়তনে শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে শুরু হওয়া অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির প্রয়াত সদস্যদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। অনুষ্ঠানে নতুন কমিটির সদস্যদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় এবং অতিথিরা পদকজয়ী শিক্ষার্থীদের ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন মুক্তকণ্ঠ ট্রাস্টের সমন্বয়ক মাহবুবা সুলতানা।
বাংলাদেশ দলের হয়ে রৌপ্যপদক জিতেছেন চট্টগ্রাম কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. রায়হান সিদ্দিকী। ব্রোঞ্জপদক জয় করেছেন ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী তাহসিন খান, রাজউক উত্তরা মডেল কলেজের এসএসসি পরীক্ষার্থী এম জামিউল হোসেন, ঢাকা ইমপিরিয়াল কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী জাওয়াদ হামীম চৌধুরী, ঢাকার ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী মনামী জামান এবং চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট ইংলিশ স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী মোহাম্মদ মারজুক রহমান।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিশিষ্ট পদার্থবিজ্ঞানী ও যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস ডার্টমাউথের সাবেক এক্সিকিউটিভ ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক মোহাম্মদ আতাউল করিম বলেন, "আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডের পদক কোনো যাত্রার শেষ নয়, বরং বড় স্বপ্ন দেখার এবং নতুন চ্যালেঞ্জ গ্রহণের সূচনা। আজকের এই শিক্ষার্থীদের মধ্যেই ভবিষ্যতের বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, উদ্যোক্তা, শিক্ষাবিদ ও জাতীয় নেতৃত্ব গড়ে উঠবে। তাঁদের সবচেয়ে বড় শক্তি হবে কৌতূহল, প্রশ্ন করার সাহস এবং আজীবন শেখার মানসিকতা।"
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বর্তমান যুগে শিক্ষার্থীদের বহুমুখী দক্ষতার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, "শুধু গণিত বা বিজ্ঞান জানাই যথেষ্ট নয়; যোগাযোগদক্ষতা, নেতৃত্ব, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধও সমান গুরুত্বপূর্ণ।"
বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির সভাপতি এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটারবিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের ডিস্টিংগুইশড অধ্যাপক মোহাম্মদ কায়কোবাদ শিক্ষার্থীদের বিনয়ী থেকে জ্ঞানচর্চা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়ে বলেন, "আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডের পদক অর্জন গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটিই চূড়ান্ত গন্তব্য নয়।" তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এগিয়ে নিতে বর্তমান পদকজয়ীদেরও ভূমিকা রাখতে হবে।
ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান কে এম মোজিবুল হক বলেন, "ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া, অন্যের মতামতকে মূল্য দেওয়া এবং দলগতভাবে কাজ করার মধ্য দিয়েই ভবিষ্যতের নেতৃত্ব তৈরি হয়।"
ডাচ্–বাংলা ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, শিক্ষা ও মেধাবিকাশমূলক বিভিন্ন উদ্যোগের পাশাপাশি বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটি সম্পৃক্ত এবং ভবিষ্যতেও পাশে থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
মুক্তকণ্ঠ সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, "বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড শুধু একটি প্রতিযোগিতা নয়, বরং শিক্ষার্থীদের মধ্যে গণিত, বিজ্ঞান ও সৃজনশীল চিন্তার একটি জাতীয় আন্দোলন গড়ে তুলেছে।"
বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন বলেন, "এ সাফল্যের পেছনে শুধু পদকজয়ী শিক্ষার্থীরাই নয়, বরং একাডেমিক টিম, স্বেচ্ছাসেবক, সংগঠক ও অভিভাবকদেরও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।"
স্বাগত বক্তব্যে বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডের সদ্য সাবেক সাধারণ সম্পাদক মুনির হাসান বলেন, "এবারই প্রথম আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে দেশের ছয়জন প্রতিযোগীর সবাই পদক অর্জন করেছে, যা দেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক অর্জন।"
বাংলাদেশ গণিত দলের কোচ অধ্যাপক মাহবুবুল আলম মজুমদার জানান, গণিত অলিম্পিয়াডের সাফল্যের পথ ধরেই দেশে পদার্থবিজ্ঞান, তথ্যবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান ও রসায়নসহ বিভিন্ন অলিম্পিয়াডের বিস্তার ঘটেছে, যা শিক্ষার মানোন্নয়নে ভূমিকা রাখছে।
অভিভাবকদের অনুভূতি ব্যক্ত করে ব্রোঞ্জপদকজয়ী এম জামিউল হোসেনের বাবা মো. জাকির হোসেন বলেন, "এ অর্জন শুধু বাংলাদেশেই নয়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও দেশের সুনাম ছড়িয়ে দিচ্ছে।"
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বুয়েটের অধ্যাপক আবদুল হাকিম খান, রাজিয়া বেগম, মো. শাহাদাত উল্লাহ খান, সহযোগী অধ্যাপক রিজওয়ানা রিয়াজ, আবুল বাসার, নাসির খান সৈকত, মো. বায়েজিদ ভূঁইয়া, অধ্যাপক মো. হায়দার আলী বিশ্বাস, অধ্যাপক তানিয়া এস খালেক, আজমত ইকবাল, অধ্যাপক হাসান ইউ জামান, সকাল রায়, সহযোগী অধ্যাপক মো. রাজিব আরেফিন, সুজানা আজমী পলিন, সামিন রিয়াসাত, মো. জাহিদ হোসাইন খান, নাফিস তিহাম, আশরাফুল আল শাকুর, মো. মুহতাসিম ফুয়াদ, প্রত্যয় ঘোষ, জ্যোতি সিংহ এবং নর্মদা দাশ মিথুন।
উল্লেখ্য, ২০০৪ সালে আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডের সদস্যপদ লাভ করে বাংলাদেশ। এ পর্যন্ত দেশ ১টি স্বর্ণ, ৮টি রৌপ্য, ৪৫টি ব্রোঞ্জপদক ও ৪৭টি সম্মানজনক স্বীকৃতি পেয়েছে। ২০০১ সালে মুক্তকণ্ঠের বিজ্ঞান প্রজন্ম পাতায় ‘নিউরনে অনুরণন’ থেকে এই আন্দোলনের সূচনা হয়। ডাচ্-বাংলা ব্যাংক পিএলসির পৃষ্ঠপোষকতায় এবং মুক্তকণ্ঠের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় প্রতিবছর এই আয়োজন করা হয়।