চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলায় ১৮০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ১৩০টিতেই দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষক পদটি খালি রয়েছে। এতে উপজেলার ৭২ শতাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। ফলে শিক্ষার্থীদের পাঠদানসহ বিদ্যালয়ের দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
কয়েকটি বিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক ও স্থানীয় শিক্ষা কর্মকর্তাদের মতে, সহকারী শিক্ষক পদ থেকে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির জটিলতা গত কয়েক বছরে নিরসন না হওয়ায় এবং শূন্য পদে নতুন করে প্রধান শিক্ষক পদে লোক নিয়োগ না হওয়ায় এই সংকট তৈরি হয়েছে। তবে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা বলেছেন, জটিলতা কাটার পর শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণ হবে।
প্রধান শিক্ষক পদে চলতি দায়িত্বে থাকা সিপাইকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষক মাহেনুর আক্তার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, তাঁর বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ১৫০ জন। সহকারী শিক্ষক আছেন পাঁচজন। প্রায় পাঁচ বছর ধরে বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ খালি। ফলে এই পদে তিনি চলতি দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি আরও বলেন, পাঠদান ছাড়াও প্রশাসনিক, দাপ্তরিক ও নানা সরকারি কর্মসূচি পালনের দায়িত্ব তাঁর কাঁধে। শিক্ষকদের পাঠদান তদারকি, শিক্ষা কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা, মাসিক সভায় যোগদান ও বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত শিক্ষা কার্যালয়ে জমা দেওয়া—এসব কাজের ঝামেলা সামলাতে হচ্ছে।
‘এতগুলো কাজ সামলানো কষ্টকর। তবু চেষ্টা করে যাচ্ছি।’
২ জুলাই মুক্তকণ্ঠের প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে প্রধান শিক্ষকের ৬৫ হাজারের বেশি অনুমোদিত পদের মধ্যে ৩৬ হাজার ২৩৫টি পদ শূন্য। অর্থাৎ প্রায় ৫৫ শতাংশ বিদ্যালয়ে নেই প্রধান শিক্ষক। সে তুলনায় মতলব উত্তরের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে সংকটটি আরও প্রকট বলে সংশ্লিষ্টরা উল্লেখ করেন।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, কোনো কোনো বিদ্যালয়ে দুই মাস ধরে এবং কোনো কোনো বিদ্যালয়ে প্রায় পাঁচ বছর ধরে প্রধান শিক্ষকের এসব পদ শূন্য রয়েছে। ৪০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদে চলতি দায়িত্বে আছেন জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষকেরা। বাকি বিদ্যালয়গুলোতে সহকারী শিক্ষকেরা ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রধান শিক্ষক না থাকা ১৩০টি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৩৮ হাজার।
গত মঙ্গলবার উপজেলার সিপাইকান্দি, উত্তর ঠেটালিয়া, দক্ষিণ ঠেটালিয়া, নান্দুরকান্দি, শাহবাজকান্দি, উত্তর লুধুয়া ও দক্ষিণ ব্যাসদী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ কয়েকটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে একাধিক শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা হয়। প্রধান শিক্ষক না থাকায় পাঠদান, প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক কাজ বিঘ্নিত হওয়া—এমন বিষয়সহ বিভিন্ন সমস্যার কথা উঠে আসে।
প্রধান শিক্ষক না থাকায় নিজেদের ভোগান্তির কথা জানিয়ে উপজেলার নান্দুরকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী তানজিলা আক্তার মুক্তকণ্ঠকে বলে, ‘আমাগো স্কুলে অনেক দিন ধইরা হেড স্যার (প্রধান শিক্ষক) নাই। এলিগা ক্লাসের খুব সমস্যা অইতাছে। টানাটানি কইরা ক্লাস অয়। কেউ কাউরে ভালা কইরা মানে না। হেড স্যার থাকলে সব দিক থেইকাই ভালা অইত।’ প্রায় একই ধরনের বক্তব্য উপজেলার সিপাইকান্দি, শাহাবাজকান্দি ও দক্ষিণ ব্যাসদী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অন্তত ৯ শিক্ষার্থীর।
সিপাইকান্দি গ্রামের বাসিন্দা ও ফতেপুর পূর্ব ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য গোলাম নবী খোকনের অভিযোগ, তাঁর এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়টিতে কয়েক বছর ধরে প্রধান শিক্ষকের পদ খালি। এতে বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমন্বয় ও নিয়মশৃঙ্খলার ঘাটতি তৈরি হয়েছে বলেও তিনি জানান। গত প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার ফলাফলেও এর প্রভাব পড়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তবে এ বিষয়ে আশার কথা শুনিয়েছেন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (প্রাথমিক) হারুনুর রশিদ। মুক্তকণ্ঠকে তিনি বলেন, সহকারী শিক্ষকদের প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি প্রাপ্তির বিষয়ে উচ্চ আদালতে মামলা চলায় দীর্ঘদিন তাঁদের পদোন্নতি আটকে ছিল। প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদে নতুন করে লোক নিয়োগও হয়নি। পদোন্নতির মামলার চূড়ান্ত রায় হওয়ায় এখন প্রধান শিক্ষক পদে সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতিতে বাধা নেই। প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণ হবে এতে। বিদ্যালয়ের সার্বিক কার্যক্রমও বেগবান হবে বলে তিনি জানান। শূন্য পদের তালিকা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে পাঠিয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন হারুনুর রশিদ।