ভারতে অবস্থান করা বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে এলে আইন তার নিজস্ব গতিতেই চলবে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা দেশে এসে সারেন্ডার (আত্মসমর্পণ) করতে চাইলে সম্ভবত সারেন্ডারের আগেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে।
আজ বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে আইন মন্ত্রণালয়ে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন আইনমন্ত্রী। বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের (ডিবিএলএ) সঙ্গে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) এবং ব্র্যাকের সামাজিক ক্ষমতায়ন ও আইনি সুরক্ষা কর্মসূচির পৃথক দুটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর উপলক্ষে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
ছাত্র–জনতার গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার বিষয়ে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে যে বক্তব্য দিয়েছেন, সে প্রসঙ্গে সরকারের পদক্ষেপ আইনমন্ত্রীর কাছে জানতে চান সাংবাদিকেরা।
জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘প্রথম কথা হলো, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাঁর (শেখ হাসিনা) প্রত্যর্পণের চেষ্টা করছে কি করছে না, সেটা আপনি কীভাবে জানেন? অবশ্যই চেষ্টা করছে, আমি বলছি। দ্বিতীয়ত হলো, একজন ফাঁসির আসামি হলেও তিনি যদি বাংলাদেশের নাগরিক হন, বাংলাদেশের আইনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে বাংলাদেশে এসে সারেন্ডার (আত্মসমর্পণ) করতে চায়, সেখানে হয়তো সারেন্ডারের আগেই অ্যারেস্ট (গ্রেপ্তার) হবেন। কিন্তু তাঁর সেই তো অধিকার তো আছে। আসলে আসবেন, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। আইনের ব্যত্যয় করে আমরা কিছু করব না। আইন যেভাবে আমাদের অথোরিটি (কর্তৃত্ব) দিয়েছে, আমরা সে অথোরিটি এক্সারসাইজ করব।’
শেখ হাসিনার কাছে পাসপোর্ট নেই— তিনি কীভাবে দেশে আসবেন—এমন প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘উনি কীভাবে আসবেন, এটা ওনার সমস্যা। এটা আমার সমস্যা না। আমাদের...চৌহদ্দির মধ্যে যখন ঢুকবেন, সেই চৌহদ্দিতে ঢুকলে আইন যেটা আমাকে ক্ষমতা দিয়েছে, আমি আইনের প্রয়োগটা করব।’
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘এটা এখন পর্যন্ত আমাদের কোনো আলোচনায় আসেনি। আমি বলেছি সাংবিধানিক ব্যাখ্যা। সংবিধানে আছে,...রাষ্ট্রপতি যেদিন পদত্যাগ করবেন, তার থেকে ৯০ দিনের মধ্যে পরবর্তী নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। প্রশ্ন এসেছিল যে, আমরা বিশেষ অধিবেশন ডাকব কি না। ৯০ দিন যেহেতু সময় আছে, আর আমার নেক্সট অধিবেশন ৬০ দিনের মধ্যে ডাকতে হবে। গত অধিবেশন শেষ হওয়া থেকে আগামী অধিবেশন পর্যন্ত ৬০ দিনের মধ্যে আমার ডাকতে হবে। সুতরাং, এই দুইটা সময় যেহেতু ম্যাচ করছে, আমি সে কারণে বলছি, বিশেষ অধিবেশনের আপাতত প্রয়োজনীয়তা দেখছি না। যদি সরকার মনে করে, নিশ্চয়ই ডাকতে পারেন।’
আইন মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, মামলার জট নিরসনে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে সরকার কাজ করছে। তিনি জানান, সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে আইনি সহায়তা ও মধ্যস্থতা কার্যক্রম পরিচালনাকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ে তোলা হয়েছে। এর মাধ্যমে আদালতে নতুন মামলা দায়েরের প্রবণতা কমবে এবং বিচারপ্রার্থীরা দ্রুত ও কার্যকর সেবা পাবেন।
আইনমন্ত্রী আরও জানান, এক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, দেশের ২০টি জেলায় নির্দিষ্ট কয়েকটি আইনের আওতায় ২০২৬ সালের মার্চ থেকে মে মাসে নতুন মামলা দায়েরের হার আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬২ শতাংশের বেশি কমেছে। তিনি বলেন, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি কার্যক্রমের ইতিবাচক ফল হিসেবে বিষয়টি দেখা যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতের জন্য আশাব্যঞ্জক।
বিচার বিভাগকে এডিআর প্রক্রিয়াকে আরও উৎসাহিত করতে আহ্বান জানান আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিচারাধীন উপযুক্ত মামলাগুলো মধ্যস্থতার মাধ্যমে নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হলে আদালতের ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় আইনগত সংস্কার আনতে সরকার প্রস্তুত বলেও জানান তিনি।
সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, ব্লাস্টের সহযোগিতায় ঢাকা, গাজীপুর ও চট্টগ্রামে পাইলট ভিত্তিতে কোর্ট প্যারা লিগ্যাল নিয়োগের মাধ্যমে শ্রমিকদের আইনি সহায়তা দেওয়া হবে। একই সঙ্গে ব্লাস্ট পরিচালিত সফল মধ্যস্থতাকে আইনগত স্বীকৃতি এবং ব্যর্থ মধ্যস্থতার ক্ষেত্রে আদালতে মামলা দায়েরের জন্য প্রয়োজনীয় প্রত্যয়নপত্র দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
অন্যদিকে, ব্র্যাকের সেল্প কর্মসূচির সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের আওতায় পেশাদার মধ্যস্থতাকারীদের প্রশিক্ষণ, সনদ প্রদান, সফল মধ্যস্থতার আইনগত স্বীকৃতি, ব্যর্থ মধ্যস্থতার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রতিবেদন প্রদান ও যৌথ মনিটরিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
অনুষ্ঠানে আইন ও বিচার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এস এম এরশাদুল আলম ও মো. খাদেম উল কায়েস, বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মনজুরুল হোসাইন, ব্র্যাকের সামাজিক ক্ষমতায়ন ও আইনগত সুরক্ষা কর্মসূচি (এসইএলপি) ও জেন্ডার জাস্টিস অ্যান্ড ডাইভারসিটি প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক শাশ্বতী বিপ্লব, ব্লাস্টের অবৈতনিক নির্বাহী পরিচালক সারা হোসেনসহ আইন ও বিচার বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।