নারায়ণগঞ্জের পঞ্চবটি মোড়। বিকেল গড়াতেই এখানে ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও যাত্রীবাহী বাসের দীর্ঘ সারি। সাথে শিল্পকারখানার শ্রমিকদের বাড়ি ফেরার ব্যস্ততা। দীর্ঘ যানজট যেন এই সড়কের প্রতিদিনের দৃশ্য। তবে এই ভোগান্তি দূর হতে চলেছে। মাথার ওপর দৃশ্যমান এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের শেষ মুহূর্তের কাজ চলছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের আশা, আগামী সেপ্টেম্বরেই চালু হবে মূল উড়াল অংশ এবং ডিসেম্বরের মধ্যেই পুরো প্রকল্পের নির্মাণকাজ শেষ হবে।
বিসিক শিল্পনগরী, সিমেন্ট কারখানা, কোল্ড স্টোরেজ ও রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কারণে এই সড়কটি দেশের অন্যতম ব্যস্ত শিল্প করিডোরে পরিণত হয়েছে। ফলে প্রায় এক দশক ধরে ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কয়েক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় ব্যয় করতে হয়। এই দীর্ঘদিনের যানজট এবং দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগের ভোগান্তি দূর করতেই ৩ হাজার ৩১৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে এই এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি চালু হলে শুধু নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জ নয়, বরং দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সড়ক নেটওয়ার্কেও বড় পরিবর্তন আসবে। রাজধানী ঢাকা প্রবেশ না করেই চট্টগ্রাম, সিলেট ও পূর্বাঞ্চল থেকে দক্ষিণাঞ্চলগামী যানবাহন সরাসরি এই করিডোর ব্যবহার করতে পারবে, যা সময়, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় কমিয়ে আনবে।
২০২১ সালের জানুয়ারিতে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৬৫৯ কোটি টাকা এবং লক্ষ্য ছিল ২০২৫ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করা। তবে ভূমি অধিগ্রহণ, ইউটিলিটি লাইন স্থানান্তর ও নকশাগত পরিবর্তনের কারণে প্রকল্পের মেয়াদ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত বাড়ানো হয় এবং ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৩১৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকায়। বর্তমানে ভৌত অগ্রগতি ৯৬ শতাংশের বেশি। মূল এলিভেটেড অংশের পিলার, গার্ডার ও ডেক নির্মাণ শেষ করে এখন বিটুমিন, লাইটিং, কার্পেটিং, র্যাম্প সংযোগ ও টোল প্লাজার কাজ চলছে।
১০ দশমিক ৮১ কিলোমিটারের এই প্রকল্পের আওতায় ৮ দশমিক ৬৮ কিলোমিটার দীর্ঘ দুই লেনের এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ৫টি র্যাম্প, ৫টি টোল প্লাজা, ৭টি এক্সেল লোড কন্ট্রোল স্টেশন, প্রশস্ত সংযোগ সড়ক, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, ট্রাক স্ট্যান্ড এবং নন-মোটরাইজড যানবাহনের জন্য পৃথক পার্কিং সুবিধা থাকছে। এছাড়া পঞ্চবটি মোড়ে যানজট কমাতে ফতুল্লা ও চাষাঢ়ামুখী ছয় লেনের সংযোগ সড়ক এবং তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু থেকে মুক্তারপুর পর্যন্ত বিদ্যমান সড়ক চার লেনে উন্নীত করা হচ্ছে।
সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অনুযায়ী, এক্সপ্রেসওয়েটি চালু হলে এই রুটে ভ্রমণের সময় প্রায় ৬২ দশমিক ৮৯ শতাংশ কমবে, যানবাহনের গড় গতি ৪ দশমিক ৪৫ গুণ বাড়বে এবং যানজটজনিত বিলম্ব ৭৪ দশমিক ৭৪ শতাংশ হ্রাস পাবে।
নির্মাণকাজের সময়কার দুর্ভোগের কথা বললেও এর সুফল পাওয়ার অপেক্ষায় আছেন স্থানীয়রা। ট্রাকচালক মো. আব্দুল করিম বলেন, "পঞ্চবটি থেকে মুক্তারপুর পর্যন্ত কয়েক কিলোমিটার পথ পার হতে অনেক সময় এক থেকে দেড় ঘণ্টা লেগে যায়। বিশেষ করে সকালে ও বিকেলে পরিস্থিতি আরও খারাপ থাকে। এক্সপ্রেসওয়ে চালু হলে সময় যেমন বাঁচবে, তেমনি জ্বালানি খরচও কমবে। এতে পরিবহন খাতের আমরা সবাই উপকৃত হবো।"
বিসিকের গার্মেন্টস কর্মী রুবিনা আক্তার বলেন, "প্রতিদিন অফিসে যাওয়া-আসার সময় যানজটে আটকে থাকতে হয়। অনেক সময় নির্ধারিত সময়ে আমাদের কর্মস্থলে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। প্রকল্পটি চালু হলে আমাদের মতো হাজারো শ্রমিকের যাতায়াত সহজ হবে বলে আশা করছি।"
মুক্তারপুর এলাকার ব্যবসায়ী মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, "নির্মাণকাজ চলাকালে ধুলাবালি ও যানজটের কারণে ব্যবসায় কিছুটা প্রভাব পড়েছিল। তবে আমরা এটিকে সাময়িক অসুবিধা হিসেবেই দেখেছি। কারণ প্রকল্প চালু হলে ক্রেতাদের যাতায়াত বাড়বে, পণ্য পরিবহন সহজ হবে এবং ব্যাবসাও বাড়বে।"
বাসচালক মো. নুরুল ইসলাম বলেন, "যানজটের কারণে একটি ট্রিপ শেষ করতে অতিরিক্ত সময় লাগে। এতে জ্বালানি খরচ বাড়ে, আবার নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়ে। নতুন এক্সপ্রেসওয়ে চালু হলে এসব সমস্যা অনেকটাই কমবে বলে আশা করছি।"
স্থানীয় বাসিন্দা নাসরিন আক্তার বলেন, "নির্মাণকাজের সময় কিছুটা ভোগান্তি হয়েছে। তবে কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে দেখে আমাদের ভালোই লাগছে। যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চালু হয়, তাহলে এই এলাকার বাসিন্দা হিসেবে আমাদের বহুদিনের দুর্ভোগ কমে যাবে।"
প্রকল্পের ডেপুটি টিম লিডার প্রকৌশলী জহুরুল হক মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "নির্মাণাধীন পঞ্চবটি-মুক্তারপুর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে চলছে। বর্তমানে প্রকল্পের প্রায় ৯৩.২৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। মূল এলিভেটেড অংশের সব ধরনের কাঠামোগত নির্মাণ শেষ হয়েছে। এখন সেখানে লাইটিং, বিটুমিন (অ্যাসফল্ট) কার্পেটিংয়ের কাজ চলমান রয়েছে, যা আগামী এক মাসের মধ্যেই সম্পন্ন করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছি।"
তিনি আরও বলেন, "এরপর সংযোগ সড়ক, র্যাম্প এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর অবশিষ্ট কাজ শেষ করতে আরও প্রায় দুই মাস সময় লাগবে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যেই এলিভেটেড অংশটি যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা সম্ভব হবে এবং চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই পুরো প্রকল্পের শতভাগ কাজ সম্পন্ন হবে, এতে নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জের মধ্যে যাতায়াত আরও সহজ, দ্রুত ও নির্বিঘ্ন হবে।"
প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ওহিদুজ্জামান জানান, শুরুতে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ২২৮ কোটি টাকা, যা পরে ২ হাজার ৬৫৯ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। তবে ভূমি অধিগ্রহণের ব্যয় ৮৩৬ কোটি টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকায় পৌঁছানোর কারণে সংশোধিত ডিপিপিতে মোট ব্যয় ৩ হাজার ৩১৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকা হয়।
তিনি আরও জানান, "এলিভেটেড অংশের মূল নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। বর্তমানে ব্ল্যাকটপ, রোড মার্কিং, এক্সপ্যানশন জয়েন্ট, সৌর স্ট্রিট লাইট ও টোল প্লাজার কাজ চলছে। ইতোমধ্যে ৫৮৬টি সৌর স্ট্রিট লাইটের মধ্যে প্রায় ২৭০টি স্থাপন করা হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগস্টের শেষ বা সেপ্টেম্বরের শুরুতে এলিভেটেড অংশ চালুর লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। আর চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে পুরো প্রকল্পের সব কাজ শেষ করে যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হবে।"
প্রকল্পের আওতায় পঞ্চবটি থেকে তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু পর্যন্ত ছয় কিলোমিটার অ্যাট-গ্রেড সড়ক উন্নয়ন, তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু থেকে মুক্তারপুর পর্যন্ত ৩ দশমিক ৭৫ কিলোমিটার সড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ এবং মুক্তারপুর সেতুর দক্ষিণ প্রান্তে ৪৪৩ মিটার চার লেন সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। এছাড়া ১৭ দশমিক ৬১ কিলোমিটার ড্রেন, ৫টি টোল প্লাজা, ৭টি এক্সেল লোড স্কেল, ট্রাক স্ট্যান্ড, পার্কিং এবং কাশিপুর ও গোগনগর সেতুর প্রশস্তকরণ করা হচ্ছে। চর সৈয়দপুরে তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতুর সংযোগস্থলে একটি গোলচত্বর নির্মাণ করা হচ্ছে, যেখানে টোল প্লাজা ও ওজন পরিমাপক স্টেশন থাকবে। নিচের সড়ক সাধারণ যানবাহনের জন্য উন্মুক্ত থাকলেও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহারে নির্ধারিত টোল পরিশোধ করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রকল্পের সাথে কার্যকর টোল ব্যবস্থাপনা, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে এটি ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আরও গতিশীল করবে এবং দেশের শিল্প ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে।