দেশের সরকারি স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো কেবল অর্থের অভাবের কারণে নয়, বরং মূলত দুর্বল ব্যবস্থাপনার ফল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের একটি গবেষণায় এই চিত্র উঠে এসেছে। উল্লেখ্য, দুই বছর আগে ওই ইনস্টিটিউটের করা অন্য একটি গবেষণাতেও একই ধরনের সংকটের কথা জানা গিয়েছিল।
গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি থাকলেও তা পরিচালনার জন্য দক্ষ জনবল নেই। আবার কোথাও মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট বা অপারেটর থাকলেও যন্ত্রপাতি অকার্যকর হয়ে পড়ে আছে। বিশেষ করে ইমেজিং সেবার জন্য সনোগ্রাফার এবং প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার জন্য মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদের বড় অংশ দীর্ঘদিন শূন্য থাকায় সেবা ব্যাহত হচ্ছে। সরকারি হাসপাতালে ৫২% রোগনির্ণয় যন্ত্র থেকেও নেই।
যন্ত্রপাতি অকেজো হয়ে থাকার অন্যতম কারণ হিসেবে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থার অতিরিক্ত কেন্দ্রীয়করণকে চিহ্নিত করা হয়েছে। ন্যাশনাল ইলেকট্রো-মেডিক্যাল ইকুইপমেন্ট মেইনটেন্যান্স ওয়ার্কশপ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার এই দায়িত্ব পালন করলেও তাদের কার্যক্রম মূলত কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ। বিভাগীয় পর্যায়ে সক্ষমতার অভাবে নষ্ট যন্ত্র দ্রুত মেরামত করা সম্ভব হয় না। স্থানীয়ভাবে মেরামত করতে চাইলেও প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক যন্ত্র স্থায়ীভাবে অকার্যকর হয়ে যায়।
ডায়াগনস্টিক সেবার ক্ষেত্রে যন্ত্রপাতি, দক্ষ জনবল, প্রয়োজনীয় রিএজেন্ট ও সরঞ্জাম এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ—এই চারটি উপাদানের সমন্বয়ের অভাব পুরো ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে তুলছে। এছাড়া সরকারের জনবল নিয়োগ পরিকল্পনায় চিকিৎসক ও নার্সদের গুরুত্ব দেওয়া হলেও কারিগরি জনবলের নিয়োগে অবহেলা করা হচ্ছে। অথচ রোগীর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিশ্চিত করতে এই কর্মীদের ভূমিকা অপরিহার্য। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কতজন চিকিৎসক বা নার্স নিয়োগ হলো তার চেয়ে বড় কথা হলো রোগীরা হয়রানি ছাড়া কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন কি না।
ওষুধ সরবরাহের ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এমএসআর ফান্ডের বড় অংশ এসেনসিয়াল ড্রাগ কোম্পানি (ইডিসিএল) থেকে ওষুধ কেনার জন্য নির্ধারিত থাকলেও প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা সীমিত। সময়মতো ওষুধ না পাওয়া কিংবা বিকল্প উৎস থেকে স্থানীয়ভাবে কেনার অনুমোদন না থাকায় বরাদ্দের অর্থ অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে।
২২টি হাসপাতালের ওপর করা এই গবেষণার ফলাফল সারা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থারই প্রতিফলন বলে মনে করা হচ্ছে। জনবল, যন্ত্রপাতি, বাজেট ব্যবস্থাপনা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতিগুলো একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। তাই কেবল অবকাঠামো বা যন্ত্রপাতি বাড়িয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়; বরং পুরো ব্যবস্থাপনার একটি সমন্বিত সংস্কার প্রয়োজন।
এই মত ব্যক্ত করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ।