কম উৎপাদন খরচ, দ্রুত ফলন এবং নিরাপদ চাষ পদ্ধতির কারণে বাগেরহাটে অফ সিজনে লাউ চাষে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। বিশেষ করে চিংড়ি ঘেরের অব্যবহৃত আইলকে কাজে লাগিয়ে মাছ ও সবজি একই সঙ্গে উৎপাদনের মাধ্যমে বাড়তি আয় করছেন তারা। বিষমুক্ত ও নিরাপদ হওয়ায় এই লাউ স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে সরবরাহ করা হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, জেলার বিভিন্ন উপজেলার মাঠজুড়ে বাঁশ ও সুতার মাচায় ছেয়ে গেছে সবুজ লাউগাছ। রাসায়নিক কীটনাশকের বদলে পরিবেশবান্ধব ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহারের ফলে উৎপাদিত লাউ হচ্ছে স্বাস্থ্যসম্মত। মাত্র ৫০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে ফলন আসায় এই চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে।

লাউচাষি রহিম শেখ বলেন, "ঘেরের আইলে লাউ চাষ করায় আলাদা জমির প্রয়োজন হয় না। বর্ষার পানিতেও গাছের তেমন ক্ষতি হয় না। অফ সিজনে বাজারে লাউয়ের সরবরাহ কম থাকায় বেশ ভালো দাম পাওয়া যায়।"

প্রথমবার অফ সিজনে লাউ চাষে সফল কৃষক বিনয় বালা বলেন, "শুরুতে কিছুটা শঙ্কা থাকলেও কৃষি বিভাগের পরামর্শ মেনে ভালো ফলন পেয়েছি। এখন পর্যন্ত প্রায় ২০ হাজার টাকার লাউ বিক্রি করেছি। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আরও প্রায় এক লাখ টাকার লাউ বিক্রি করতে পারব বলে আশা করছি।"

তিনি আরও জানান, প্রতিদিন পাইকাররা সরাসরি ক্ষেত থেকে লাউ কিনে নিয়ে যান, যা বাগেরহাটের পাশাপাশি ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী ও বরিশালসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে পাঠানো হয়। আগামী বছর আরও বেশি জমিতে লাউ চাষের পরিকল্পনা রয়েছে তার।

ক্রেতা সাগর শেখ বলেন, "বাগেরহাটের অফ সিজনের লাউ আকারে বড়, স্বাদেও ভালো। বিষ কম ব্যবহার করায় নিশ্চিন্তে কিনতে পারি। দাম কিছুটা বেশি হলেও মান ভালো হওয়ায় কিনছি।"

স্থানীয় বাসিন্দা রাসেল আহমেদ জানান, আগে এই সময়ে বাজারে লাউ পাওয়া যেত না, এখন স্থানীয় উৎপাদনে তাজা লাউ পাওয়া যাচ্ছে যা কৃষক ও ক্রেতা উভয়ের জন্যই লাভজনক।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বাগেরহাট জেলার সদর, কচুয়া, মোরেলগঞ্জ, ফকিরহাট, মোল্লাহাট, চিতলমারী, রামপাল, মোংলা ও শরণখোলা উপজেলার প্রায় ৭৮ হাজার মৎস্য ঘেরের আইলে বর্তমানে পুঁইশাক, চালকুমড়া, ঢ্যাঁড়শ, পেঁপে, লাউ, টমেটো, করলা, শিম, বরবটি, বাঙ্গি, কলা, মিষ্টিকুমড়া ও লালশাকসহ ২০ থেকে ২৫ ধরনের সবজি আবাদ হচ্ছে।

জেলার বড় পাইকারি সবজি হাটগুলোর মধ্যে সদর উপজেলার বারাকপুর, শ্রীঘাট, পোলেরহাট ও সি অ্যান্ড বি বাজার অন্যতম। প্রতি হাটবারে এখান থেকে ৭০ থেকে ৮০ ট্রাক সবজি দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। প্রতি হাটে ১ থেকে ২ কোটি টাকার সবজি বিক্রি হয় এবং এই খাতে ২০০ থেকে ৩০০ শ্রমিকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।

বাগেরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. মোতাহার হোসেন বলেন, "চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ৯ হাজার ২৮০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ধরনের সবজির আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে অফ সিজনের লাউ চাষ উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে চিংড়ি ঘেরের আইলকে কাজে লাগিয়ে কৃষকেরা লাউ চাষ করছেন। একই জমিতে উপরে লাউ এবং নিচে মাছ চাষ হওয়ায় উৎপাদন খরচ কমছে, জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হচ্ছে এবং কৃষকেরা দ্বিগুণ লাভবান হচ্ছেন। সদর, মোল্লাহাট, চিতলমারী, ফকিরহাট ও মোরেলগঞ্জ উপজেলায় এ ধরনের চাষের পরিধি দ্রুত বাড়ছে।"

তিনি আরও বলেন, "স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বাগেরহাটের অফ সিজনের লাউ এখন ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হচ্ছে। ঘেরে মাছ চাষ থাকায় কৃষকেরা অতিরিক্ত রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার না করে ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করছেন। ফলে নিরাপদ, বিষমুক্ত ও মানসম্মত লাউ উৎপাদন হচ্ছে, যার বাজারে চাহিদাও অনেক বেশি।"

মোতাহার হোসেন আরও বলেন, "কৃষি বিভাগ নিরাপদ সবজি উৎপাদনে কৃষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। অফ সিজনে ভালো দাম পাওয়ায় এ চাষ কৃষকদের জন্য অত্যন্ত লাভজনক হয়ে উঠেছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে বাগেরহাটের অফ সিজনের সবজি দেশের অন্যতম ব্র্যান্ড হিসেবে পরিচিতি পাবে এবং এ খাতে আরও নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে।"