তিন মাসের ব্যবধানে ‘সাইবার সুরক্ষা আইন’ আবার সংশোধন করতে যাচ্ছে সরকার। নতুন ধারা যুক্ত করে আইনটি আরও কঠোর করা হচ্ছে; একই সঙ্গে বাড়ানো হচ্ছে শাস্তিও। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র বলছে, গুজব, অপতথ্য, হেয়প্রতিপন্ন ও মানহানিকর তথ্য—এ চারটি শব্দকে অপরাধের সংজ্ঞায় এনে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে শাস্তির আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে সংশোধিত আইনে। এ ছাড়া আইন বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং ক্ষমতাপ্রাপ্ত অন্য সংস্থাকে যুক্ত করা হচ্ছে।‘

অন্য সংস্থার সরাসরি নাম না থাকলেও ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারকে (এনটিএমসি) বোঝানো হয়েছে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র মুক্তকণ্ঠকে নিশ্চিত করেছে। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সংসদের পরবর্তী অধিবেশনে সংশোধিত আইনটি পাস হতে পারে।

.
সংশোধিত আইনটি পাস হলে এর অপপ্রয়োগ হবে। এ ছাড়া অনলাইন স্বাধীনতার বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবনমন হবে। এই সূচক গণতন্ত্রের পরিবেশের একটি ভিত্তি।
মিরাজ আহমেদ চৌধুরী, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ডিজিটালি রাইট
.

সংশোধিত আইনে নতুন একটি ধারা (২৬/ক) যুক্ত করে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি সাইবার পরিসরে গুজব ও অপতথ্য প্রকাশ বা প্রচার করলে তা অপরাধ বলে গণ্য হবে। কেউ এ ধরনের অপরাধ করলে তিনি অনধিক ১০ বছর কারাদণ্ড ভোগ করবেন বা অনধিক ৪০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

সংশোধিত আইনের খসড়ায় গুজবের সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছে। তাতে বলা হয়, গুজব অর্থ এমন কোনো অসমর্থিত বা অযাচাইকৃত তথ্য, সংবাদ বা দাবি, যা জনমনে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক, উত্তেজনা বা সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করে অথবা অস্থিরতা তৈরি করার ঝুঁকি থাকে।

অপতথ্যের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, এমন কোনো মিথ্যা, বিকৃত বা বিভ্রান্তিকর তথ্য যা ব্যক্তি, জনসাধারণ, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রকে বিভ্রান্ত, প্রতারিত বা ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রকাশ বা প্রচার করা হয়।

.
আইনবিশেষজ্ঞদের একটি অংশের মতে, নতুন ধারার ভাষা ও সংজ্ঞা যত সম্ভব নির্দিষ্ট হওয়া প্রয়োজন। বিশেষত ‘গুজব’, ‘অপতথ্য’ নির্ধারণে স্পষ্ট মানদণ্ড না থাকলে আইনটির প্রয়োগ নিয়ে বিতর্ক হতে পারে।
.সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের উদ্যোগ, হচ্ছে কনটেন্ট অপসারণে মেটাকে বাধ্য করার বিধান.

সরকারের একাধিক নীতিনির্ধারক মুক্তকণ্ঠকে জানিয়েছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভুয়া ভিডিও, অডিও, বিভ্রান্তিকর ছবি দিয়ে অপপ্রচার ঠেকাতে কঠোর শাস্তির বিধান যুক্ত করা হচ্ছে।

তবে প্রযুক্তি–বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের যুগে ফিরছে বাংলাদেশ। তড়িঘড়ি করে পাস না করে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে।

আইনবিশেষজ্ঞদের একটি অংশের মতে, নতুন ধারার ভাষা ও সংজ্ঞা যত সম্ভব নির্দিষ্ট হওয়া প্রয়োজন। বিশেষত ‘গুজব’, ‘অপতথ্য’ নির্ধারণে স্পষ্ট মানদণ্ড না থাকলে আইনটির প্রয়োগ নিয়ে বিতর্ক হতে পারে।

.
সূত্র বলছে, আইনটির সংশোধন নিয়ে সরকারের মধ্যে মিশ্র অবস্থান রয়েছে। কেউ সংশোধনের পক্ষে যুক্তি দিচ্ছেন, কেউ বিরোধিতা করে বলছেন, এতে সমালোচনা হবে, অপপ্রয়োগ হবে, বৈশ্বিক চাপ আসবে।
.সাইবার আইনের অপব্যবহার আগের সরকারের দমন–পীড়নেরই পুনরাবৃত্তি: এইচআরডব্লিউ.

সংশোধিত আইনের ২৫ নম্বর ধারায় নতুন দুটি শব্দ যোগ করা হচ্ছে। মানহানি ও হেয়প্রতিপন্ন–সংক্রান্ত অপরাধ ও দণ্ড নিয়ে বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি কারও মানহানি বা হেয়প্রতিপন্ন করতে কোনো তথ্য অডিও, ভিডিও চিত্র, অডিও-ভিজ্যুয়াল চিত্র, স্থির চিত্র, গ্রাফিকস বা অন্য উপায়ে ধারণ বা সম্পাদিত, এআই দিয়ে নির্মিত কোনো তথ্য প্রকাশ বা প্রচার করেন, তবে তা অপরাধ বলে গণ্য হবে। এ অপরাধে ৫ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হচ্ছে বা অনধিক ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

কোনো নারী বা ১৮ বছরের কম বয়সীদের বিরুদ্ধে মানহানি বা হেয়প্রতিপন্ন করে কিছু প্রচার করলে অনধিক ১০ বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ৪০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। মানহানির ব্যাখ্যায় দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারার কথা বলা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোয় সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তি, রাজনৈতিক দলের নেতাসহ বিভিন্ন পেশার মানুষের বিরুদ্ধে গুজব ও অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে, যা সরকার ও দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। এ বাস্তবতায় বিদ্যমান আইন সংশোধন করে নতুন কিছু ধারা যুক্ত করা হচ্ছে।

.সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫: উন্নততর, তবে দ্বৈততা তৈরি করবে কিছু ধারা.

তবে সূত্র বলছে, আইনটির সংশোধন নিয়ে সরকারের মধ্যে মিশ্র অবস্থান রয়েছে। কেউ সংশোধনের পক্ষে যুক্তি দিচ্ছেন, কেউ বিরোধিতা করে বলছেন, এতে সমালোচনা হবে, অপপ্রয়োগ হবে, বৈশ্বিক চাপ আসবে।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ব্যাপক বিরোধিতার মুখে ২০১৮ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কার্যকর হয়। এরপর ভিন্নমত দমনে প্রায়ই আইনটিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। ২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার আইনটি বাতিল করে। পরে তারা ‘সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫’ জারি করে। গত ৩০ এপ্রিল অধ্যাদেশ রহিত করে ‘সাইবার সুরক্ষা বিল-২০২৬’ সংসদে পাস করে। বিলটি পাস হওয়ার মাত্র তিন মাসের মধ্যে আবারও সংশোধন করা হচ্ছে।

আইনে সংশোধন এনে কিছু ধারা যুক্ত করে সরকার গত সরকারের মতো ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের যুগে ফেরত যাচ্ছে কি না, সে প্রশ্ন উঠবে বলে মনে করেন ডিজিটালি রাইটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী। তথ্যব্যবস্থায় প্রযুক্তির প্রভাব নিয়ে গবেষণা করা প্রতিষ্ঠানটির প্রধান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, নিশ্চিতভাবে বলা যায়, সংশোধিত আইনটি পাস হলে এর অপপ্রয়োগ হবে। এ ছাড়া অনলাইন স্বাধীনতার বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবনমন হবে। এই সূচক গণতন্ত্রের পরিবেশের একটি ভিত্তি।

.গুজবকারীদের সাইবার আইনের আওতায় আনার বিষয়টি বিবেচনা করছে সরকার: তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী