ধরুন, নতুন একটি ফোন কার্টে যোগ করলেন। অর্ডারও দিয়ে দিলেন। কিছুক্ষণ পর কুরিয়ারকে দেখছেন, আপনার বাসার দিকে এগিয়ে আসছে। বাস্তবে তবে আপনি এক টাকাও খরচ করেননি, আর আপনার দরজায় কোনো পণ্যও পৌঁছাবে না। এমনই অদ্ভুত অভিজ্ঞতার কথা শুনে দক্ষিণ কোরিয়ায় জনপ্রিয় হচ্ছে ‘ডোপামিন সাইট’—যেখানে কেনাকাটার রোমাঞ্চ থাকে, কিন্তু সত্যিকারের কেনাকাটা হয় না।

এই ধরনের ওয়েবসাইটকে ঘিরে আলোচনার মূল বিষয় হলো, এটি মূলত ভুয়া অনলাইন শপিং প্ল্যাটফর্ম। কেনাকাটার পুরো অভিজ্ঞতাই নকল—পণ্য দেখা থেকে শুরু করে কার্টে যোগ করা, অর্ডার দেওয়া, এমনকি কুরিয়ারের অবস্থান ট্র্যাক করাও সম্ভব। তবু শর্তটি স্থির: কোনো টাকা খরচ হয় না, আর কোনো পণ্যও কখনো পৌঁছায় না। এত ‘সিমুলেটেড’ কেনাকাটার নেশা কেন তৈরি হলো এবং লাখো তরুণ কেন এতে সময় কাটাচ্ছেন—সেসব প্রশ্ন এখনো খোলাই।

প্রথম দিকে এসব ওয়েবসাইটকে সাধারণ ই-কমার্স সাইটের মতোই মনে হতে পারে। পণ্যের ছবি দেখা যাবে, রিভিউ পড়া যাবে, কার্টে যোগ করা যাবে, এমনকি অর্ডারও দেওয়া যাবে।

এরপর শুরু হয় আরেক ধাপ। পর্দায় দেখা যায়, একজন কুরিয়ার সার্ভিস কর্মী আপনার অর্ডার নিয়ে রওনা দিয়েছেন। ম্যাপের মাধ্যমে তাঁর অবস্থানও দেখা যায়। অনেক ব্যবহারকারীর কাছে বিষয়টি এতটাই বাস্তব মনে হয় যে তারা শুরুতে বুঝতে পারেন না—এটি আসলে একটি সিমুলেশন। তবে শেষ পর্যন্ত দরজায় কোনো কড়া নাড়বে না, কারণ কোনো পণ্যই পাঠানো হয় না।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, অনেক মানুষের ক্ষেত্রে কেনাকাটার সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অংশটি পণ্য হাতে পাওয়ার সময় নয়; বরং অপেক্ষার মধ্যেই থাকে। অর্ডার দেওয়ার পর কুরিয়ারের অবস্থান বারবার দেখা, কখন পণ্য আসবে—এই প্রত্যাশা এবং অপেক্ষা—মস্তিষ্কের পুরস্কারব্যবস্থাকে সক্রিয় করতে পারে এবং ডোপামিন নিঃসরণের সঙ্গে সম্পর্কিত অনুভূতি তৈরি করতে পারে। দক্ষিণ কোরিয়ার এই ওয়েবসাইটগুলো মূলত সেই মনস্তাত্ত্বিক অভিজ্ঞতাকেই কাজে লাগিয়েছে। অর্থাৎ কেনাকাটার আনন্দের অংশটুকু পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু বিল দিতে হচ্ছে না।

দক্ষিণ কোরিয়ায় জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইনফ্লুয়েন্সার সংস্কৃতি ও অনলাইন বিজ্ঞাপনও তরুণদের মধ্যে নতুন কেনার আকাঙ্ক্ষা তৈরি করছে—তবে সবার পক্ষে নিয়মিত কেনাকাটা করা সম্ভব হয় না। ফলে অনেকের কাছে এসব সাইট এক ধরনের ‘নিরাপদ বিকল্প’ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। একজন ব্যবহারকারী মজা করে বলেছেন, ‘এটা অনলাইন শপিংয়ের কারাওকে—সব অনুভূতি আছে, কিন্তু কোনো আর্থিক ক্ষতি নেই।’

তবে এই ধারণার পেছনের কারণ পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। কিছু ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা হলো, হঠাৎ করে কিছু কিনে ফেলার প্রবণতা (ইমপালস বায়িং) কমাতে এসব সাইট সহায়ক হতে পারে। কেনার ইচ্ছা জাগলে অনেকেই বাস্তব ই-কমার্স সাইটে না গিয়ে এসব প্ল্যাটফর্মে সময় কাটান। অন্যদিকে সমালোচকেরা বলছেন, এতে হয়তো কেনাকাটার অভ্যাস কমছে না; বরং একই আচরণ ভিন্নভাবে চালু থাকছে।

এই ট্রেন্ড নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে। এসব ওয়েবসাইট কারা পরিচালনা করছে, ব্যবহারকারীদের তথ্য কীভাবে সংরক্ষণ বা ব্যবহার করা হচ্ছে—এ বিষয়ে স্পষ্ট উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। যদিও এখানে সত্যিকারের কেনাকাটা হয় না, তবু ব্যবহারকারীর ব্রাউজিং অভ্যাস, পছন্দ বা অন্যান্য তথ্য সংগ্রহের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।

এ ধরনের প্রবণতা নিয়ে বাংলাদেশেও আলোচনা আছে। অনলাইন কেনাকাটা দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে, একই সঙ্গে ফেসবুক, টিকটক ও বিভিন্ন ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের বিজ্ঞাপন অনেককেই তাৎক্ষণিক কেনাকাটায় উৎসাহিত করে। ফলে বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে এ ধরনের ধারণা অন্য দেশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবে এটি সত্যিই মানুষের অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা কমাতে সাহায্য করবে, নাকি কেবল সাময়িক মানসিক তৃপ্তি দেবে—তা জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

সূত্র: ইয়াহু ও মিটইনক