ভোর সাড়ে তিনটা। শহর তখনো পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। কিন্তু ময়মনসিংহ নগরের কয়েকটি সিএনজি ফিলিং স্টেশনের সামনে এরই মধ্যে শতাধিক অটোরিকশা, প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস ও অ্যাম্বুলেন্সের দীর্ঘ সারি। কারও হাতে চায়ের কাপ, কেউ ঘুমজড়ানো চোখে স্টিয়ারিংয়ে মাথা রেখে বসে আছেন। সবার অপেক্ষা একটাই—গ্যাস আসবে কি?

সকাল বাড়ার সাথে সাথে লাইনের দৈর্ঘ্য বাড়লেও গ্যাসের চাপ বাড়ছে না। অনেকে পাঁচ ঘণ্টা অপেক্ষার পর খালি ট্যাংক নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন, আবার কেউ দিনের অর্ধেক সময় লাইনে কাটিয়ে বুঝতে পারছেন আজকের আয় আর হবে না। গত এক সপ্তাহ ধরে জেলার প্রায় প্রতিটি সিএনজি ফিলিং স্টেশনে এই দৃশ্য এখন নিত্যনৈমিত্তিক।

গ্যাসের এই ঘাটতি কেবল পরিবহনেই নয়, বিদ্যুৎ উৎপাদনেও তীব্র প্রভাব ফেলেছে। তীব্র গরমে দিনে চার থেকে ১০ ঘণ্টারও বেশি সময় লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবন। এর ফলে পরিবহন, শিল্প, ব্যবসা, কৃষি, মৎস্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় সৃষ্টি হয়েছে বহুমাত্রিক সংকট।

ভালুকা উপজেলার হবিরবাড়ি ইউনিয়নের সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক জহির মিয়া একটি এনজিও থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে প্রায় আট লাখ টাকা দিয়ে অটোরিকশা কিনেছিলেন। প্রতি মাসে প্রায় অর্ধলক্ষ টাকা কিস্তি পরিশোধ করতে হয় তার। কিন্তু গ্যাস সংকটে গাড়ি চালাতে না পেরে তিনি এখন চরম দুশ্চিন্তায়। তিনি বলেন, "গ্যাস না পেলে সংসার চালানো যাবে না, কিস্তিও পরিশোধ করা সম্ভব না। তাই ভোরে লাইনে দাঁড়াই। কখনো দুপুর হয়, কখনো বিকেল হয়, তারপরও গ্যাস পাই না। এখন সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছি। এই সংকট চলতে থাকলে কিস্তি পরিশোধ করা সম্ভব হবে না।"

একই অভিজ্ঞতার কথা জানান ভালুকার একটি শিল্পকারখানার গাড়িচালক ফাহিম আহমেদ। তিনি বলেন, "একটা স্টেশন থেকে আরেকটা স্টেশনে ঘুরছি। কোথাও গ্যাস নেই, কোথাও চাপ এত কম যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়েও গ্যাস পাওয়া যায় না। জনভোগান্তি নিরসনে গ্যাস সংকট দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন।"

গ্যাস সংকটে চালকদের পাশাপাশি যাত্রীরাও চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। এলপিজি ব্যবহার করে গাড়ি চালানোর চেষ্টা করলেও খরচ বাড়ায় ভাড়া নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে প্রায়ই বাগ্‌বিতণ্ডা হচ্ছে। ফলে অনেক চালক গাড়ি বের করছেন না, যা অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও রোগীদের জন্য সমস্যা প্রকট করেছে। ত্রিশালে বেসরকারি কোম্পানিতে কর্মরত মোজাম্মেল হক জানান, গ্যাস সংকটের কারণে অটোরিকশা পাওয়া যাচ্ছে না এবং চালকেরা বাড়তি ভাড়া আদায় করছেন।

পরিস্থিতির চরম অবনতিতে গত ২২ জুলাই সকালে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের দিগারকান্দা এলাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকেরা সড়ক অবরোধ করেন। প্রায় আড়াই ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকায় মহাসড়কের দুই পাশে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। পুলিশের হস্তক্ষেপে অবরোধ উঠলেও চালকদের একাংশ পুনরায় রাজপথে নামার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। অটোরিকশাচালক মোনায়েম হোসেন বলেন, "গত কয়েক দিন আগে চালকেরা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন। মানুষের ভোগান্তির কথা বিবেচনা করে কয়েক ঘণ্টা পর অবরোধ সাময়িক প্রত্যাহার করা হয়। কিন্তু এখন চালকদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। রুটিরুজি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হওয়ায় চালকেরা আবারও ফুসে উঠে রাজপথে নেমে আসতে পারেন।"

আবাসিক গ্রাহকদের অবস্থাও শোচনীয়। নগরীর ৬ নম্বর ওয়ার্ডের গৃহিণী আফসানা খাতুন বলেন, "এই ওয়ার্ডে বিদ্যুতের সমস্যা প্রকট, যে কারণে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে যাচ্ছে। বাচ্চারা গরমের কারণে পড়ালেখায় মনোযোগ হারাচ্ছে। এর সঙ্গে ভোগাচ্ছে গ্যাস সংকটও। দুই সংকটে প্রতিনিয়ত ভোগান্তি বাড়ছে।"

জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস কম সরবরাহ হচ্ছে। এর প্রভাব প্রথমে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পাঞ্চলে এবং পরে সিএনজি স্টেশন ও আবাসিক গ্রাহকদের ওপর পড়েছে। নিটল টাটা সিএনজি পাম্পের প্রকৌশলী রাজিব আহমেদ বলেন, "আমরা বর্তমানে গ্যাস পাচ্ছি না। এই সংকটের কারণে আমরা গ্যাস সরবরাহ করতে পারছি না।"

তিতাস গ্যাসের ময়মনসিংহ অঞ্চলের কার্যালয়ও স্বল্পচাপের কথা স্বীকার করে বিজ্ঞপ্তি দিলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার কোনো নিশ্চয়তা দেয়নি। তিতাস গ্যাস অ্যান্ড ট্রান্সমিশন ময়মনসিংহ কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক শামীম হোসেন বলেন, "আমদানিনির্ভর এলএনজির সমস্যার কারণে গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে সমস্যা সৃষ্টি হওয়ায় গ্যাস সংকট এখন জাতীয় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। তবে দ্রুতই এই সংকট কেটে যাবে বলে আশা করছি।"

শিল্পাঞ্চল ভালুকার বহু কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, দীর্ঘমেয়াদি সংকট হলে রপ্তানি আদেশে সমস্যা হতে পারে। অন্যদিকে, বিদ্যুৎ খাতের বিপর্যয় সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। সদরের গোপালনগরের আজিজুল হক বলেন, "বিদ্যুৎ গেলে গরমে ঘরে থাকা যায় না। মশার উপদ্রবও বেড়ে যায়।" তারাকান্দার রিপন মিয়া বলেন, "কখন বিদ্যুৎ যাবে, কখন আসবে—এর কোনো ঠিক নেই।"

লোডশেডিংয়ের কারণে অনলাইন ক্লাস, ফ্রিল্যান্সিং ও ক্ষুদ্র ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ত্রিশালের মাছচাষি হারেজ আলী জানান, বিদ্যুৎ না থাকায় পানি সঞ্চালন ব্যাহত হওয়ায় মাছের বৃদ্ধি কমেছে এবং পোনা উৎপাদনকারী খামারগুলো ক্ষতির মুখে পড়েছে। পোল্ট্রি খামারেও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা দেখা দিয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ময়মনসিংহ জোনে (ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, শেরপুর, জামালপুর ও টাঙ্গাইলের পাঁচটি উপজেলা) প্রতিদিন বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট, যার বিপরীতে বর্তমানে ৩০০ থেকে ৪০০ মেগাওয়াট লোডশেডিং হচ্ছে। গুদারাঘাট বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা ২১০ মেগাওয়াট হলেও গ্যাস না পেয়ে উৎপাদন এখন শূন্যের কোটায়।

ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী মোহাম্মদ জোনাব আলী বলেন, "প্রায় ১৫ দিন যাবত গ্যাস না পেয়ে গুদারাঘাট বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। ফলে বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের ওপর ভিত্তি করে লোডশেডিং করতে হচ্ছে।"