অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও জীবনমান উন্নয়নের জন্য উৎপাদন বাড়ানো প্রয়োজন, তবে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় না থাকলে সেই উন্নয়ন টেকসই হবে না বলে মনে করেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু। বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বন ভবনে বন অধিদপ্তরের আয়োজনে ‘বিশ্ব বাঘ দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে মন্ত্রী উল্লেখ করেন, উৎপাদন বাড়াতে গেলে কলকারখানা গড়ে উঠবে, যা পরিবেশ ও প্রতিবেশের ওপর প্রভাব ফেলবে। আইনের প্রয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাদের আইনের অভাব নেই। বাংলাদেশে যে কটা আইন আছে যদি আপনি শতভাগ প্রয়োগ করেন তাহলে কলকারখানা সব বন্ধ করে দিতে পারবেন। বাড়িঘরের দরজাও লক করে দিতে পারবেন।’

মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী প্রশ্ন করেন, পরিবেশ রক্ষায় সব মানুষকে দেশ থেকে বের করে দেওয়া কি সম্ভব? তিনি বলেন, ‘আমার কথায় আপনারা খারাপ কিছু মনে করিয়েন না। আমি কিন্তু আপনাদের পক্ষের লোক। আমাকে মাঠের বাস্তবতা তুলে ধরতে হবে। কত ধরনের আইন আছে দেখলাম। একটা আছে ইটভাটা সব বন্ধ করে দিতে হবে। ২ হাজার ৩০০ কোটি ইট লাগে দেশে বছরে। পারবেন বন্ধ করতে? বিকল্প কী? আছে ব্লক। সেটাতে ২০ কোটি উৎপাদন হয়। যখনই ইট পোড়াবেন তখনই পরিবেশদূষণ হবে। বিকল্প ব্যবস্থা না হলে এসব বন্ধ করা যাবে না।’

পার্বত্য অঞ্চলে বাঘের নতুন আবাসস্থল তৈরির প্রস্তাবের সমালোচনা করে আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, ‘ওখানে এমনিতে হাতি নিয়ে সমস্যায় আছি। এখন বাঘ ছেড়ে দিলে তো মানুষ সব বের করে দিতে হবে। এটাই আমাদের বাস্তবতা। বাস্তবতাকে ধর্তব্যে না আনলে কোনো আইন কাজ করবে না। মানুষই যদি না থাকল তাহলে বাঘ থাকলেই–বা কী, না থাকলেই কী।’

মন্ত্রী আরও সতর্ক করে বলেন, প্রকৃতি ও বন্য প্রাণীর সঙ্গে সহাবস্থান করতে চাইলে খুব সতর্কতার সঙ্গে এগোতে হবে। পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের মধ্যে সামঞ্জস্য আনতে না পারলে ভবিষ্যৎ উন্নয়ন টেকসই হবে না।

অনুষ্ঠানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম এ আজিজ বাঘ সংরক্ষণের চ্যালেঞ্জ ও করণীয় বিষয়ে একটি গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন। তিনি জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য হ্রাস পাচ্ছে। গবেষণাপত্রে তিনি উল্লেখ করেন, বাঘ যেসব প্রাণী শিকার করে তার ৭৯ শতাংশই হরিণ। সুতরাং বাঘ রক্ষা করতে হলে হরিণ রক্ষা করতে হবে। সুন্দরবনে শিকারিদের পাতা ফাঁদ হরিণের জন্য বড় বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, বাঘ সংরক্ষণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বনের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। এজন্য বিশ্বব্যাংক, প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক জোট ও জার্মান সংস্থা জেআইজেড বিকল্প জীবিকা গড়ে তুলতে কাজ করছে।

মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ফাহমিদা খানম বলেন, বাঘের জন্য বনের ভেতরে ও বাইরে উভয় দিকেই হুমকি রয়েছে। সুন্দরবনের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে শিল্পকারখানার দূষণ কমিয়ে আনতে হবে।

বন অধিদপ্তরের বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলের বন সংরক্ষক মো. ছানাউল্যা পাটোয়ারির উদ্বোধনী বক্তব্যের পর অনুষ্ঠানে ওয়াইল্ড টিমের তৈরি একটি সচেতনতামূলক ভিডিও প্রদর্শিত হয়। বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন আইইউসিএনের বাংলাদেশ কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ বিপাশা এস হোসেন এবং খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ।