সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের পানাউল্লাহ আহমেদ হলের ৩০৪ নম্বর কক্ষের বাসিন্দা মাহমুদুল হাসান বিবেক। অনার্স জীবনের শেষ প্রান্তে এসে জুলাই মাস এলেই তার স্মৃতিতে ভেসে ওঠে দুই বছর আগের সেই উত্তাল দিনগুলো। হলের বারান্দা, বন্ধুদের আড্ডা আর ক্যাম্পাসের পরিচিত পরিবেশ তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের স্মৃতিতে।

আন্দোলনের সময় তিনি জামালপুর শহরের চাররাস্তা এলাকার একটি মেসে থাকতেন। সহপাঠীদের সঙ্গে রাজপথে নেমে আন্দোলনের কর্মসূচিতে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি। সেই অংশগ্রহণই তাকে এনে দেয় জীবনের এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা—গ্রেপ্তার, থানায় আটক এবং প্রথমবারের মতো কারাবাস। কয়েক দিনের সেই অভিজ্ঞতা বদলে দেয় তার ছাত্রজীবনের গতিপথ।

বিবেকের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৮ জুলাই সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ থেকে তাদের আন্দোলন শুরু হয়। এরপর বিভিন্ন দিনে নানা কর্মসূচি পালন করা হয়। ১৮ জুলাই সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজসহ শহরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে জামালপুর শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কের আশপাশে জড়ো হতে থাকেন। হঠাৎ মাইকে আন্দোলনের স্লোগান শুরু হলে মুহূর্তেই সেখানে বহু মানুষ ভিড় করেন। একপর্যায়ে রেলপথ অবরোধ করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করলে শিক্ষার্থীরা ইটপাটকেল ছুড়ে প্রতিরোধের চেষ্টা চালায়। পুলিশ কিছুটা পিছু হটলেও টানা কয়েক ঘণ্টা ধরে থেমে থেমে উত্তেজনা বিরাজ করে।

এই পরিস্থিতির মধ্যেই পুলিশ বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীকে আটক করে, যাদের মধ্যে ছিলেন মাহমুদুল হাসান বিবেক। তাদের জামালপুর থানা হেফাজতে রাখা হয়, যা ছিল তাদের প্রথম কারাবাসের অভিজ্ঞতা। এ নিয়ে বিবেক বলেন, "কারাগারের ভেতরের প্রথম রাতটা এখনও ভুলতে পারি না। এর আগে কখনও থানায় যেতে হয়নি। হঠাৎ করে নিজেকে আটক অবস্থায় দেখাটা খুব কঠিন ছিল। আমরা সাধারণ শিক্ষার্থী ছিলাম। আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে, তা কখনো ভাবিনি।"

বিবেকের দাবি, আটকের পর দুই দিন তাদের থানায় রাখা হয়েছিল এবং পরে পরিবারের উদ্যোগে তিনি মুক্তি পান। তবে এই অভিজ্ঞতা তাকে আন্দোলন থেকে দূরে সরিয়ে দেয়নি। তিনি আরও বলেন, "ভয় অবশ্যই ছিল। কিন্তু তখন মনে হয়েছিল, শুরু যখন করেছি, শেষ পর্যন্ত থাকব। তাই মুক্তি পাওয়ার পর আবারও আন্দোলনে যোগ দিই। আমার মুক্তির জন্য বাবা বেশ কয়েকবার থানায় গিয়েছেন। বাবা পুলিশকে বলেছিলেন, আমায় রেখে আমার ছেলেটাকে ছেড়ে দেন। শুধুমাত্র আন্দোলনে যাওয়ার কারণে আমাদের আটক করা হয়েছিল। পরে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে দুই দিন পর আমাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।"

দুই বছর পর আজ অনেক কিছু বদলে গেছে। আন্দোলনের সেই উত্তাপ নেই, ক্যাম্পাসে এসেছে নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থী। কেউ পড়াশোনার শেষ পর্যায়ে, কেউ চাকরির প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। তবে সেই সময়ের স্মৃতি এখনো বয়ে বেড়ান তারা। বর্তমানে পানাউল্লাহ আহমেদ হলে থাকা বিবেক পড়াশোনার ফাঁকে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় সেই দিনগুলোর কথা স্মরণ করেন। তার পড়ার টেবিলে এখনো সংরক্ষিত রয়েছে আন্দোলনের সময় ব্যবহৃত একটি পতাকা।

আবেগপ্লুত হয়ে বিবেক বলেন, "সেই সময়ের স্মৃতি হিসেবে পতাকাটা এখনও আমার পড়ার টেবিলে রেখে দিয়েছি। এটা দেখলেই আন্দোলনের কথা মনে পড়ে। আমি ও আমার বন্ধু সানাউল্লাহসহ আরও বেশ কয়েকজন সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলাম। গেটপাড় এলাকায় আন্দোলন চলার সময় আমি যখন একটি হোটেলে পানি খেতে যাই, তখন বাইরে পুলিশ গুলি শুরু করে। একপর্যায়ে পুলিশ ভেতরে এসে বলে, এই ধর ওকে! এই শালা নায়ক, স্লোগান মাস্টার!—এ কথা বলেই আমাকে ধরে নিয়ে গিয়ে থানায় দুই দিন আটকে রাখা হয়।"

জুলাই আন্দোলনের সবচেয়ে ভালো লাগার দিক হিসেবে তিনি সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিকে উল্লেখ করেন। তবে সবচেয়ে খারাপ লেগেছে শহীদ আবু সাঈদের মৃত্যুর ফুটেজ দেখে। তিনি বলেন, "জুলাইয়ের আন্দোলনের সময় সবচেয়ে ভালো লেগেছিল যখন দেখলাম মানুষের উপস্থিতি। প্রথমে ভেবেছিলাম মানুষ আসবে কি না, পরে দেখি সাধারণ মানুষ দলে দলে ছুটে আসছে। সেই দৃশ্যটা অনেক আশার সঞ্চার করেছিল। আর সবচেয়ে খারাপ লেগেছে যখন শহীদ আবু সাঈদ ভাইকে গুলি করে হত্যা করার ফুটেজ দেখেছি। প্রতিদিন কাউকে না কাউকে হত্যা করা হচ্ছিল। এখন আমার একটাই চাওয়া—আমার প্রিয় দেশ ভালো থাকুক, দেশের মানুষ ভালো থাকুক।"

অন্যদিকে, আন্দোলনের সামনের সারিতে থাকা আরেক শিক্ষার্থী আমিমুল ইহসান গ্রেপ্তার না হলেও তার দিনগুলো কেটেছে আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তায়। গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের হামলার ভয়ে তিনি বেশ কয়েকদিন নিজের বাড়িতেও যেতে পারেননি এবং বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপন করে থাকতে হয়।

ইহসান বলেন, "সেই সময় বাড়িতে যেতে পারিনি, পরিবারও ভীষণ উদ্বিগ্ন ছিল। প্রতিদিনই নতুন খবর আসছিল—কোথাও অভিযান, কোথাও আটক। কখন কী হয়, সেই শঙ্কা নিয়েই দিন কাটিয়েছি। শুধু যারা গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তারাই নন, অনেক শিক্ষার্থীকেই দীর্ঘ সময় ভয়ের মধ্যে থাকতে হয়েছে। কেউ বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন, কেউ রাত কাটিয়েছেন আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুদের বাসায়। এমন পরিস্থিতিও ছিল যে রাস্তা দিয়ে কোনো শিক্ষার্থী গেলে ছাত্রলীগের কর্মীরা তাদের ব্যাগ ও ফোন তল্লাশি করত।"

দুই বছর পর সেই দিনগুলোর কথা স্মরণ করে ইহসান বলেন, "সময় বদলেছে, পরিস্থিতিও বদলেছে। সকলের সম্মিলিত চেষ্টায় আন্দোলনটা সফল হয়েছে। জামালপুর শহরের সেই জায়গাগুলোতে গেলে এখনো মনে হয়, এই জায়গাগুলোতে পুলিশ আমাকে ও আমার ভাইদের আহত করেছে, তাড়া করেছে। তবে সেই দিনগুলোর কথা আজও ভুলতে পারিনি। এখন একটাই চাওয়া—দেশটা ভালো থাকুক, মানুষ ভালো থাকুক।"

জুলাই আন্দোলনের দুই বছর পর অনেক কিছু পরিবর্তিত হলেও তাদের কাছে 'জুলাই' কেবল একটি মাস নয়; বরং এটি স্মৃতি, সংগ্রাম, ভয়, সাহস এবং স্বপ্নের এক জীবন্ত অধ্যায়।