বৈদ্যুতিক খুঁটির তারে সারি বেঁধে বসে থাকা পাখি আমাদের নিত্যদিনের পরিচিত দৃশ্য। তবে উচ্চ ভোল্টেজের তারে বসেও তারা কীভাবে নিরাপদ থাকে, তা অনেকের কাছেই কৌতূহলের বিষয়। মানুষ খোলা বৈদ্যুতিক তার স্পর্শ করলে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার প্রবল ঝুঁকি থাকে, কিন্তু পাখির ক্ষেত্রে কেন তা ঘটে না?

এর উত্তর লুকিয়ে আছে বিদ্যুতের একটি মৌলিক বৈজ্ঞানিক নীতিতে। বিদ্যুৎ প্রবাহিত হওয়ার জন্য একটি সম্পূর্ণ পথ বা সার্কিট এবং দুটি ভিন্ন বৈদ্যুতিক বিভবের মধ্যে সংযোগ থাকা প্রয়োজন। কেবল বিদ্যুৎবাহী তার স্পর্শ করলেই কেউ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয় না।

যখন একটি পাখি একটি মাত্র বৈদ্যুতিক তারে বসে, তখন তার দুই পা একই তার স্পর্শ করে থাকে। ফলে দুই পায়ের মধ্যে ভোল্টেজের কোনো উল্লেখযোগ্য পার্থক্য তৈরি হয় না। ভোল্টেজের এই পার্থক্যের অনুপস্থিতিতে বিদ্যুৎ পাখির শরীরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার প্রয়োজন বোধ করে না; বরং তারের ভেতর দিয়েই চলতে থাকে।

অন্যদিকে, মানুষ যখন খোলা বৈদ্যুতিক তার স্পর্শ করে, তখন সাধারণত শরীরের অন্য কোনো অংশ মাটি বা অন্য কোনো পরিবাহী বস্তুর সংস্পর্শে থাকে। এতে বিদ্যুতের জন্য একটি সম্পূর্ণ পথ তৈরি হয় এবং বিদ্যুৎ শরীরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে শক দেয়।

তবে পাখি সব সময় নিরাপদ থাকে না। নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে তারাও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হতে পারে। যেমন—একই সময়ে দুটি ভিন্ন বৈদ্যুতিক তার স্পর্শ করলে, অথবা একটি তারের পাশাপাশি মাটির সঙ্গে সংযুক্ত কোনো ধাতব খুঁটি বা যন্ত্র স্পর্শ করলে। এছাড়া বড় ডানার কারণে দুটি তারের মধ্যে সংযোগ তৈরি হলেও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

ঈগল, শকুন বা সারসের মতো বড় পাখিদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি। তাদের ডানার বিস্তার বেশি হওয়ায় তারা অনেক সময় একই সঙ্গে দুটি তার অথবা একটি তার ও বৈদ্যুতিক খুঁটির অংশ স্পর্শ করে ফেলে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বড় পাখিদের মৃত্যুর অন্যতম কারণ হিসেবে এই বিদ্যুৎ লাইনের দুর্ঘটনাগুলো চিহ্নিত করা হয়।

পাখির জন্য একটি তারে বসা নিরাপদ মনে হলেও মানুষের জন্য তা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বাস্তবে মানুষের পক্ষে এমনভাবে একটি তারে আলাদা হয়ে বসে থাকা সম্ভব নয়। সামান্য অসাবধানতায় শরীরের অন্য অংশ মাটি বা পরিবাহী বস্তুর সংস্পর্শে চলে আসতে পারে, যা প্রাণঘাতী হতে পারে।

পরিশেষে, বৈদ্যুতিক তারে বসে থাকা পাখির এই নিরাপত্তা কোনো বিশেষ ক্ষমতার ফল নয়, বরং বিদ্যুতের সহজ বৈজ্ঞানিক নিয়মের বহিঃপ্রকাশ। একটি মাত্র তার স্পর্শ করলে দুই পায়ে একই বৈদ্যুতিক বিভব থাকে বলে শরীর দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয় না। তবে দুটি ভিন্ন তার বা মাটির সংযোগ তৈরি হলেই পাখিও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়। তাই বিদ্যুৎ নিয়ে কৌতূহল থাকলেও খোলা বৈদ্যুতিক তার থেকে সর্বদা নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা উচিত।

সূত্র: টিভি ৯