গুমের তদন্তের দায়িত্ব জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে দেওয়ার বিষয়টি থাকলেও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রস্তাবিত আইনে সেই দায়িত্ব পুলিশকে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রস্তাবিত আইনের কাঠামো অনুযায়ী, পুলিশ অভিযোগ না নিলে ভুক্তভোগীর পক্ষে যে কেউ এখতিয়ারভুক্ত ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে উপস্থিত হয়ে নালিশি মামলা করতে পারবেন।

আইনের খসড়াটি অংশীজনদের মতামতের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে তুলে দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, সবার মতামত নিয়ে আইনটি চূড়ান্ত করে মন্ত্রিসভায় পাঠানো হবে। মন্ত্রিসভার বৈঠকেও সংযোজন-বিয়োজন হতে পারে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামীকাল বুধবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে এই আইনের খসড়া নিয়ে একটি আন্তমন্ত্রণালয় সভা হওয়ার কথা রয়েছে। শিগগিরই মন্ত্রিসভায় প্রস্তাবিত আইনটি তোলা হবে। পরবর্তী সংসদ অধিবেশনে এটি পাস হতে পারে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গত বছর ২৮ আগস্ট উপদেষ্টা পরিষদের সভায় ‘গুম প্রতিরোধ, প্রতিকার ও সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর খসড়া নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। একই বছর ৬ নভেম্বর গুম প্রতিরোধ, প্রতিকার ও সুরক্ষা অধ্যাদেশের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয় এবং ওই দিনই গুমের অপরাধের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড রেখে অধ্যাদেশ জারি করা হয়। তবে নতুন আইনে ‘গুম প্রতিরোধ, প্রতিকার ও সুরক্ষা’ থাকছে না; নাম দেওয়া হয়েছে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন’। সুরক্ষা শব্দটি বাদ দেওয়া হচ্ছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ী হয়ে বিএনপি এসব অধ্যাদেশের বিষয়ে জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি গঠন করে। ওই কমিটির সুপারিশের আলোকে ৪টি অধ্যাদেশ বাতিল করে বিএনপি সরকার। ১৬টি অধ্যাদেশ পরবর্তী যাচাই-বাছাই করে নতুন বিল আনার সিদ্ধান্ত নেয়। যার মধ্যে গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশও ছিল। বাতিল করা অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ রয়েছে; ওই অধ্যাদেশে গুমের অপরাধ তদন্তের দায়িত্ব জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে দেওয়া হয়েছিল।

প্রস্তাবিত আইনে গুমের ঘটনা তদন্তের দায়িত্ব পুলিশকে দেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা আজ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, সিআরপিসি অনুযায়ী তদন্ত পুলিশ করে থাকে। পুলিশ ছাড়া অন্য কেউ তদন্ত করতে পারে না। সে জন্য মানবাধিকার কমিশনকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

তবে এতে গুমের ঘটনায় জবাবদিহি নিশ্চিত হবে না বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে এইচআরডব্লিউর এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, ‘পুলিশকে দিয়ে গুমের ঘটনার তদন্ত করালে কোনো জবাবদিহি নিশ্চিত হবে না এবং এই চর্চা (গুম) বন্ধ করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাও তৈরি হবে না।’

প্রস্তাবিত আইনে ‘যা রয়েছে’ অংশে বলা হয়েছে, কেউ গুমের আলামত ও সাক্ষ্যপ্রমাণ নষ্ট করলে সেটা আগের মতো অপরাধ বলে গণ্য হবে, তবে খসড়া আইনে অপরাধের শাস্তি কমানো হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশে এ অপরাধের শাস্তি সর্বনিম্ন ৭ বছর কারাদণ্ড থাকলেও খসড়া আইনে তা ৫ বছরের প্রস্তাব করা হয়েছে। জরিমানা আগের মতো ২০ লাখ টাকা রাখা হচ্ছে। একই সঙ্গে কেউ গোপন আটককেন্দ্র বা আয়নাঘরের মতো কিছু নির্মাণ করলে তাকে সর্বনিম্ন ৫ বছরের কারাদণ্ড ও অনধিক ২০ লাখ টাকা জরিমানা গুনতে হবে। অধ্যাদেশে কারাদণ্ড ৭ বছর ছিল। এখানেও সাজা দুই বছর কমানো হচ্ছে। তবে খসড়া আইনে গুমকে আগের মতোই একটি স্বতন্ত্র ও ‘চলমান’ ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

খসড়া আইনে গুমের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারী কিংবা কোনো শৃঙ্খলা বাহিনী (সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, পুলিশ, আনসার, বিজিবি, কোস্টগার্ড, গোয়েন্দা সংস্থা, র‍্যাব বা যেকোনো যৌথ বাহিনী) নিজ পরিচয়ে বা সরকারের সমর্থনে কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার, আটক বা অপহরণ করে এবং স্বাধীনতা হরণ করার বিষয়টি অস্বীকার করে কিংবা অবস্থান গোপন রাখে, তবে তা গুম বলে গণ্য হবে।

গুমের ফলে ভুক্তভোগীর মৃত্যু ঘটলে বা লাশ পাওয়া গেলে কিংবা ঘটনার ৫ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও নিখোঁজ ব্যক্তির কোনো সন্ধান না মিললে অপরাধীর শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। একই সঙ্গে সর্বনিম্ন ৫ বছরের কারাদণ্ডসহ অনধিক ১ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা হবে। এ ছাড়া গুমের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা সর্বনিম্ন ৩ বছরের কারাদণ্ড এবং অনধিক ৫০ লাখ টাকা জরিমানা করা যাবে।

খসড়া আইনে বলা হয়েছে, গুমের অপরাধে অধস্তনরা জড়িত থাকলে এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বা নির্দেশদাতা যদি তা জানা সত্ত্বেও প্রতিরোধে ব্যর্থ হন, অবহেলা করেন, অনুমোদন বা প্ররোচনা দেন, তবে তিনিও মূল অপরাধীর সমান শাস্তিতে (মৃত্যুদণ্ড/যাবজ্জীবন) দণ্ডিত হবেন। এতে বলা হয়, আদালত ধরে নিতে পারবেন যে অধস্তনদের ওপর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধান ছিল।

শৃঙ্খলা বাহিনীর বাইরে থাকা ঊর্ধ্বতনদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম রাখা হয়েছে আইনে। এতে বলা হয়, শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য নয় এমন কোনো ঊর্ধ্বতন ব্যক্তি অধস্তনদের দ্বারা গুম বা গুম-সংক্রান্ত অপরাধ ঘটছে বা ঘটতে যাচ্ছে—এমন তথ্য জেনেও ব্যবস্থা না নিলে বা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে অথবা অপরাধসংক্রান্ত কার্যকলাপে যুক্ত থাকলে তাঁর ক্ষেত্রেও মূল অপরাধের দণ্ড প্রযোজ্য হবে।

এ আইনের অধীন গুম–সংক্রান্ত কোনো অপরাধ হলে ভুক্তভোগী নিজে অথবা ঘটনার কোনো প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী বা ঘটনার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য জানেন এমন ব্যক্তি অভিযোগকারী হিসেবে থানার অফিসার ইনচার্জের কাছে অভিযোগ করবেন। কোনো কারণে থানার অফিসার ইনচার্জ অভিযোগ গ্রহণে অস্বীকার করলে অভিযোগকারী এখতিয়ারসম্পন্ন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সরাসরি উপস্থিত হয়ে নালিশি মামলা করতে পারবেন।

অভিযোগ পাওয়ার পর থানার অফিসার ইনচার্জ ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবেন অথবা ম্যাজিস্ট্রেট আদালত নালিশি অভিযোগ পাওয়ার পর ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবেন। তদন্ত কর্মকর্তাকে ৯০ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে (বিশেষ কারণে আদালত সর্বোচ্চ ৩০ দিন বর্ধিত করতে পারবে)। ব্যর্থ হলে তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ আইনের অধীন সরকার গুম–সংক্রান্ত একটি তথ্যভান্ডার করবে, যেখানে গুমের শিকার ব্যক্তিদের তথ্য সংরক্ষিত থাকবে।

গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনেরা দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকিং ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমে চরম ভোগান্তিতে পড়েন। এ আইনে বলা হয়েছে, নিখোঁজ ব্যক্তির স্ত্রী বা নির্ভরশীল স্বজনদের আবেদনে আদালত ‘গুম সনদের’ প্রত্যয়নপত্র ইস্যু করবেন। এর মাধ্যমে পরিবারের ভরণপোষণ ও দায় পরিশোধে ভুক্তভোগীর স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি পরিচালনা, ব্যবহার বা হস্তান্তর করা যাবে। ৫ বছর অতিক্রান্ত হলেও গুমের শিকার ব্যক্তি ফেরত না এলে সম্পত্তি বৈধ উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টনযোগ্য বলে আদালত ঘোষণা করতে পারবেন।

ভুক্তভোগীদের বিনা মূল্যে চিকিৎসা, পুনর্বাসন, আইনি সহায়তা ও ক্ষতিপূরণ দিতে সরকার একটি বিশেষ তহবিল গঠন করবে। দণ্ডিত ব্যক্তির থেকে আদায় করা জরিমানার অর্থ ভুক্তভোগী বা তার পরিবার ক্ষতিপূরণ হিসেবে পাবে।

গুমের অভিযোগটি যদি অসত্য ও হয়রানিমূলক প্রমাণিত হয়, তবে আদালত আবেদনকারীকে কারণ দর্শানোর সুযোগ দিয়ে আসামিকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ এবং মিথ্যা মামলাকারীকে অনধিক ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করতে পারবেন।