খুলনার কয়রা উপজেলার ১৪২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৮৫টিতেই নেই কোনো প্রধান শিক্ষক। অর্থাৎ উপজেলার প্রায় ৬০ শতাংশ বিদ্যালয় বর্তমানে প্রধান শিক্ষক ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে, যার ফলে পাঠদান, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং একাডেমিক তদারকিতে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটছে। এসব বিদ্যালয়ে বর্তমানে মোট শিক্ষার্থী ২২ হাজার ৮০৬ জন।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের সূত্র অনুযায়ী, ২০১৩ সালের পর থেকে উপজেলার কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নতুন প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। প্রধান শিক্ষকের শূন্য থাকা উল্লেখযোগ্য বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে রয়েছে গোবরা ঘাটাখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উত্তর মদিনাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দক্ষিণ মদিনাবাদ মুসাফিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, স্বর্ণকলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দক্ষিণ মহারাজপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৩ নম্বর কয়রা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ২ নম্বর কয়রা মধ্যবিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শ্যামখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও শ্রীরামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এছাড়া সহকারী শিক্ষকের ৪২টি পদও বর্তমানে শূন্য রয়েছে।

গোবরা গ্রামের বাসিন্দা হাবিবুর রহমানের ছেলে গোবরা ঘাটাখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণিতে পড়াশোনা করে। তিনি বলেন, "প্রধান শিক্ষক না থাকায় পাঠদান বিঘ্নিত হচ্ছে। দ্রুত স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে শিক্ষার্থীদের পাঠদান গতিশীল করা উচিত।"

এই সংকটের পেছনে মামলা-জটিলতাকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। স্বর্ণকলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নুরুল আমিন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "রেজিস্টার্ড থেকে সরকারি হওয়া উপজেলার ১০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পদমর্যাদা-সংক্রান্ত একটি মামলা এখনো বিচারাধীন। মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়ায় এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পদোন্নতি ও পদায়নের বিষয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।"

শ্যামখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুজন শিক্ষার্থী জানিয়েছে, একজন শিক্ষক অন্য কাজে ব্যস্ত থাকায় নিয়মিত ক্লাস নিতে পারেন না, ফলে তাদের পাঠদান কম হচ্ছে।

এদিকে ছয়জন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘ সময় ধরে তাদের একই সঙ্গে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান এবং বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। অফিসের নথিপত্র সংরক্ষণ, সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়ন, প্রতিবেদন প্রস্তুত এবং হিসাব-নিকাশের মতো দাপ্তরিক চাপে পাঠদানের প্রয়োজনীয় সময় ও মনোযোগ ব্যাহত হচ্ছে। তাদের মতে, শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করাই শিক্ষকের মূল দায়িত্ব, কিন্তু অতিরিক্ত প্রশাসনিক চাপের কারণে তা যথাযথভাবে পালন করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

গত রোববার গোবরা ঘাটাখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. বিল্লাল হোসেনের সঙ্গে কথা হয়। ২০২৩ সাল থেকে তিনি এই দায়িত্ব পালন করছেন। ১৫৭ জন শিক্ষার্থী এবং পাঁচজন সহকারী শিক্ষক থাকা এই বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক সব দায়িত্ব তাকেই সামলাতে হয়। তিনি বলেন, "দ্রুত একজন স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হলে বিদ্যালয়ের সার্বিক কার্যক্রম আরও সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।"

শুধু বিদ্যালয় নয়, কয়রা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়েও জনবলের ঘাটতি রয়েছে। পাঁচটি সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পদের মধ্যে তিনটি এবং অফিস সহকারীর চারটি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য।

খুলনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এই সংকট শুধু কয়রায় নয়, পুরো জেলাজুড়ে। জেলার ১ হাজার ১৫৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬০৫টিতে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য, যা অর্ধেকেরও বেশি।

খুলনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শেখ অহিদুল আলম জানান, সহকারী শিক্ষক থেকে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) ও অধিদপ্তরের মাধ্যমে নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে শূন্য পদগুলো ধাপে ধাপে পূরণ করা সম্ভব হবে।

কয়রা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা তপন কুমার কর্মকার মুক্তকণ্ঠকে জানান, সর্বশেষ ২০১৩ সালে সরাসরি প্রধান শিক্ষক নিয়োগ হয়েছিল। তিনি বলেন, "প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদগুলোর মধ্যে ১৬টি পদে চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কিছু পদে পদায়নের উদ্যোগ থাকলেও মামলা-জটিলতার কারণে তা সম্ভব হয়নি। এটি জাতীয় পর্যায়ের একটি সমস্যা।"