সমুদ্র বা নদীর জলরাশি ছাড়িয়ে মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন আমাদের খাবার, পানীয় এমনকি বাতাসের মধ্যেও মিশে গেছে। বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে যে, ফল, সবজি, মাছ, মাংস এবং বোতলজাত পানির পাশাপাশি রান্নাঘরের নানা উপকরণের মাধ্যমেও এই ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা মানবশরীরে প্রবেশ করছে।

বর্তমান সময়ে মাইক্রোপ্লাস্টিক পুরোপুরি এড়িয়ে চলা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় কিছু ছোটখাটো পরিবর্তনের মাধ্যমে শরীরে এর প্রবেশ কমিয়ে আনা সম্ভব।

খাবার গরম করার ক্ষেত্রে প্লাস্টিকের পাত্র ব্যবহার অনেকেরই অভ্যাস। কিন্তু তাপের সংস্পর্শে প্লাস্টিক থেকে ক্ষুদ্র কণা ও ক্ষতিকর রাসায়নিক খাবারে মিশে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই খাবার গরম করতে কাচ, সিরামিক বা স্টেইনলেস স্টিলের পাত্র ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে মাইক্রোওয়েভে সাধারণ প্লাস্টিকের পাত্র ব্যবহার না করাই শ্রেয়।

পানির ক্ষেত্রেও সতর্কতা প্রয়োজন। গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক সময় কলের পানির তুলনায় বোতলজাত পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরিমাণ বেশি থাকে। এই ঝুঁকি কমাতে নিরাপদ ফিল্টার করা বা বিশুদ্ধ কলের পানি পানের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

একবার ব্যবহারযোগ্য বা ডিসপোজেবল প্লাস্টিকের কাপ, প্লেট, চামচ কিংবা খাবারের বাক্স থেকেও ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা খাবারে মিশতে পারে, বিশেষ করে গরম খাবার বা পানীয়র ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পায়। এর পরিবর্তে বাড়ি ও অফিসে পুনর্ব্যবহারযোগ্য কাচ, স্টিল বা সিরামিকের পাত্র ব্যবহার করা উচিত।

রান্নাঘরের কাটিং বোর্ডের ক্ষেত্রে প্লাস্টিকের বদলে কাঠের বোর্ড ব্যবহার করা নিরাপদ, কারণ প্লাস্টিক বোর্ডে ছুরি ব্যবহারের ফলে ক্ষুদ্র কণা খাবারে মিশে যেতে পারে। তবে কাঠের বোর্ড নিয়মিত পরিষ্কার ও শুকনো রাখা জরুরি।

খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত প্যাকেটজাত ও অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলার কথা বলা হয়েছে, কারণ এগুলো প্লাস্টিকের সংস্পর্শে বেশি থাকে। এর বদলে তাজা ফল, সবজি এবং বাড়িতে তৈরি খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এছাড়া ফল ও সবজির গায়ে পরিবেশ থেকে আসা ধুলাবালি ও মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা থাকতে পারে, তাই খাওয়ার আগে পরিষ্কার পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে নেওয়া প্রয়োজন।

বাসনপত্রের ক্ষেত্রে সতর্ক হতে হবে। পুরোনো বা আঁচড় পড়া নন-স্টিক প্যানের আবরণ ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেখান থেকে সূক্ষ্ম কণা খাবারে মিশতে পারে। তাই এমন বাসন বদলে ফেলা অথবা স্টেইনলেস স্টিল বা কাস্ট আয়রনের বাসন ব্যবহার করা ভালো বিকল্প হতে পারে। পাশাপাশি, গরম খাবার প্লাস্টিকের মোড়ক বা পাত্রে দীর্ঘক্ষণ না রেখে দ্রুত কাচ বা স্টিলের পাত্রে স্থানান্তর করা উচিত।

গবেষকদের মতে, পরিবেশের সর্বত্র মাইক্রোপ্লাস্টিক ছড়িয়ে থাকায় এটি পুরোপুরি বর্জন করা অসম্ভব। তবে সচেতন অভ্যাসের মাধ্যমে এর প্রভাব কমানো সম্ভব। দীর্ঘমেয়াদে এর স্বাস্থ্যগত প্রভাব বুঝতে আরও গবেষণা চলছে।

আধুনিক জীবনের এই বাস্তবতায় আতঙ্কিত না হয়ে ছোট ছোট পরিবর্তনের মাধ্যমে ঝুঁকি কমানো সম্ভব। প্লাস্টিকের বদলে কাচ বা স্টিলের পাত্র ব্যবহার, বোতলজাত পানির ব্যবহার কমানো এবং তাজা খাবার খাওয়ার অভ্যাস শুধু প্লাস্টিকের সংস্পর্শই কমায় না, বরং সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে সহায়তা করে।

সূত্র: বিবিসি