চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সরকারি খাদ্যগুদামগুলোতে ধারণক্ষমতার চেয়ে বহুগুণ বেশি খাদ্যশস্য জমা হওয়ায় চলতি বোরো মৌসুমে ধান ও চাল সংগ্রহ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। গুদামে পর্যাপ্ত জায়গার অভাবে চালকল মালিকদের কাছ থেকে নতুন করে চাল গ্রহণ প্রায় বন্ধ হয়ে এসেছে, যার ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংগ্রহের চূড়ান্ত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় সিদ্ধ চাল, আতপ চাল ও ধান মিলিয়ে মোট ৩৪ হাজার ৪৪৪ টন খাদ্যশস্য সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত ছিল। এর বিপরীতে ইতোমধ্যে সংগৃহীত হয়েছে ২৯ হাজার ৫৮৪ দশমিক ১২০ টন। সার্বিক অর্জনের হার ৮৫ দশমিক ৮৯ শতাংশ হলেও অবশিষ্ট প্রায় ৪ হাজার ৮৬০ টন ধান-চাল সংগ্রহ নিয়ে সংকটে পড়েছে জেলা খাদ্য বিভাগ।
খাদ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জেলার ছয়টি লোকাল সাপ্লাই ডিপোর (এলএসডি) মোট ধারণক্ষমতা ১৯ হাজার ৫০০ টন। তবে বর্তমানে গুদামগুলোতে সংগৃহীত খাদ্যশস্যের পরিমাণ ২৯ হাজার ৫০০ টন ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ নির্ধারিত ধারণক্ষমতার চেয়ে প্রায় ১০ হাজার টন অতিরিক্ত ধান-চাল গাদাগাদি করে রাখা হয়েছে।
উপজেলাভিত্তিক গুদামগুলোর ধারণক্ষমতা 살펴보লে দেখা যায়—রহনপুর খাদ্যগুদামে ৬ হাজার ২৫০ টন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর গুদামে ৫ হাজার ৫০০, নাচোলে ৩ হাজার, আমনুরায় ২ হাজার ৭৫০ এবং ভোলাহাট ও শিবগঞ্জ খাদ্যগুদামে ১ হাজার টন করে ধারণক্ষমতা রয়েছে। বর্তমানে প্রায় প্রতিটি গুদামই ধারণক্ষমতার শেষ সীমানায় পৌঁছে গেছে।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের তথ্যমতে, নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে সিদ্ধ চালে ২৫ হাজার ৩২৭ টনের বিপরীতে সংগৃহীত হয়েছে ২২ হাজার ৭২ দশমিক ৩৩০ টন (৮৭ দশমিক ২১ শতাংশ)। আতপ চালে ৫ হাজার ৫৮৩ টনের বিপরীতে সংগৃহীত হয়েছে ৩ হাজার ৯৯২ দশমিক ৭৯০ টন (৮৩ দশমিক ০৫ শতাংশ)। এছাড়া ধান সংগ্রহের ক্ষেত্রে ৩ হাজার ৫৩৪ টন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে অর্জিত হয়েছে ৩ হাজার ৫১৯ টন, যা প্রায় শতভাগ (৯৯ দশমিক ৫৮ শতাংশ)।
স্থানীয় মিলমালিকদের অভিযোগ, চুক্তি অনুযায়ী চাল সরবরাহের জন্য তারা প্রস্তুত থাকলেও সরকারি গুদামে জায়গা না থাকায় তা খালাস করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে মিল প্রাঙ্গণেই বিপুল পরিমাণ চাল আটকে থাকায় তারা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। চালকল মালিকদের দাবি, দ্রুত সময়ের মধ্যে গুদাম থেকে আগের চাল অন্য জেলায় স্থানান্তর (আউটপাস) করা না হলে কিংবা সরকারি বিতরণ ব্যবস্থার মাধ্যমে গুদাম খালি করা না হলে বাকি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে না।
এই স্থানসংকট মেটাতে সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে গোমস্তাপুর উপজেলার পার্বতীপুর ইউনিয়নের বন্ধ থাকা দেওপুরা খাদ্যগুদামটির কথা আলোচনায় এসেছে। জানা গেছে, প্রায় ২০ বছরেরও বেশি সময় আগে এক দুর্ধর্ষ ডাকাতির ঘটনায় গুদামের সব খাদ্যশস্য লুট হয়ে যায়। ওই ঘটনার পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় ১ হাজার ৫০০ টন ধারণক্ষমতার এই গুদামটির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়, যা দুই দশক ধরে অকেজো হয়ে পড়ে আছে।
গুদামসংকট ও দেওপুরা খাদ্যগুদাম প্রসঙ্গে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোহন আহমেদ বলেন, "জেলার গুদামগুলোর মোট ধারণক্ষমতা ১৯ হাজার ৫০০ টন হলেও ইতোমধ্যে প্রায় সাড়ে ২৯ হাজার টন ধান ও চাল সংগ্রহ করা হয়েছে। ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি খাদ্যশস্য মজুত থাকায় গুদামগুলোতে চরম স্থানসংকট দেখা দিয়েছে। তবুও সীমিত ক্ষমতার মধ্যে সাধ্যমতো চেষ্টা চালিয়ে সংগ্রহ কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হয়েছে এবং বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।"
তিনি আরও বলেন, "স্থানসংকট লাঘবে দীর্ঘ ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ থাকা দেড় হাজার টন ধারণক্ষমতার দেওপুরা খাদ্যগুদামটি দ্রুত সংস্কার করে পুনরায় চালুর জন্য খাদ্য অধিদপ্তর ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে চিঠিপত্র আদান-প্রদান এবং যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। এটি চালু করা গেলে জেলার খাদ্যশস্য ধারণক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি স্থানসংকটও অনেকটাই কেটে যাবে।"