পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের কচিখালী অভয়ারণ্য কেন্দ্রের টাইগার পয়েন্ট এলাকায় নিয়মিত টহলের সময় বনরক্ষীদের সামনে এক বিরল দৃশ্য ধরা পড়েছে। রোববার সকালে হঠাৎ বন থেকে বেরিয়ে একটি বাঘ কচিখালী খালে নেমে পড়ে এবং ধীরস্থির ভঙ্গিতে সাঁতার কেটে খালের অপর পাড়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।
বন বিভাগের স্মার্ট টিমের বোটচালক সাইফুর রহমান মুঠোফোনে এই দৃশ্যটি ধারণ করেন। তিনি বলেন, “বাঘটি খালের মাঝে পৌঁছে টহল বোটের ইঞ্জিনের শব্দ পেয়ে আবার ঘুরে বনের দিকে চলে যায়। এত কাছ থেকে বাঘের সাঁতার দেখা তাঁর জীবনের এক বিরল অভিজ্ঞতা।”
সুন্দরবনের বাঘ সচরাচর সামনে দেখা যায় না; সাধারণত পায়ের ছাপ, শিকারের চিহ্ন বা ট্র্যাপ ক্যামেরার ছবির মাধ্যমে তাদের উপস্থিতির প্রমাণ মেলে। তবে গত এক সপ্তাহে বনকর্মীদের সামনে দুটি বিরল ঘটনা ঘটেছে। একদিন বন বিভাগের কার্যালয়ের সামনে রাজসিক ভঙ্গিতে হেঁটে বেড়িয়েছে একটি বেঙ্গল টাইগার, আর তার দুই দিন পর দেখা গেল আরেকটি বাঘ খাল সাঁতরে পার হচ্ছে।
বন বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, সুন্দরবনের পরিবেশ এখন নিরাপদ। পর্যাপ্ত খাদ্য, নিয়মিত টহল এবং মানুষের চলাচল কমে যাওয়ায় বাঘগুলো স্বাভাবিক আচরণে বেশি দেখা দিচ্ছে।
এর আগে গত শুক্রবার দুপুরে বাগেরহাটের মোংলার সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের আন্ধারমানিক ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রের বন কার্যালয়ের সামনে একটি বাঘ দেখা গিয়েছিল। জোয়ারের সময় শ্যালা নদীর তীর ঘেঁষে দক্ষিণ দিক থেকে এসে বাঘটি কিছুক্ষণ কার্যালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করে এবং এরপর ধীর পায়ে উত্তর পাশের জঙ্গলে চলে যায়। বনকর্মী শ্যামল কুমার পাল প্রথমে বাঘটিকে দেখতে পান এবং সহকর্মী ইমতিয়াজ মাসরুর মুঠোফোনে প্রায় ৩০ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ধারণ করেন। বন বিভাগের ধারণা, এটি একটি পূর্ণবয়স্ক বাঘিনী ছিল, যা ওই এলাকায় প্রায় ১৫ মিনিট অবস্থান করেছিল।
পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. শরীফুল ইসলাম জানান, টহলের সময় এত কাছ থেকে এমন দৃশ্য সচরাচর দেখা যায় না। তিনি আরও জানান, খাদ্যের সন্ধান, বিচরণ এলাকা পরিবর্তন কিংবা প্রাকৃতিক প্রয়োজনেই বাঘ নিয়মিত নদী পার হয়।
বন বিভাগের পর্যবেক্ষণে বাঘের উপস্থিতির আরও কিছু ইতিবাচক তথ্য পাওয়া গেছে। গত ১৩ জুলাই আন্ধারমানিক ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রসংলগ্ন বনে ফাঁদ থেকে উদ্ধার করে চিকিৎসা দেওয়া একটি বাঘিনীকে অবমুক্ত করা হয়। তার চলাচল পর্যবেক্ষণে প্রায় আট কিলোমিটার এলাকায় ২০টি ট্র্যাপ ক্যামেরা বসানো হয়। এসব ক্যামেরায় ওই বাঘিনী ছাড়াও আরও তিনটি বাঘের উপস্থিতি ধরা পড়ে। পাশাপাশি চিত্রা হরিণ, মায়া হরিণ, মেছো বাঘ, বনমোরগ ও বন্য শূকরসহ নানা বন্য প্রাণীর ছবি পাওয়া গেছে।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, সাম্প্রতিক সময়ে সুন্দরবনে বাঘের বিচরণ আগের তুলনায় বেশি চোখে পড়ছে। তাঁর ভাষ্য, বনে হরিণের সংখ্যাও বেড়েছে এবং নিয়মিত টহলের সময় আগের চেয়ে বেশি বাঘের পায়ের ছাপ পাওয়া যাচ্ছে, যা বাঘের সংখ্যা বাড়ার ইতিবাচক ইঙ্গিত।
বন বিভাগ জানিয়েছে, গত ১ জুন থেকে সুন্দরবনে তিন মাসের জন্য সব ধরনের প্রবেশ নিষিদ্ধ রয়েছে। বনজীবী, পর্যটক কিংবা সাধারণ মানুষের কোলাহল না থাকায় বাঘসহ অন্য বন্য প্রাণীরা এখন আরও নির্ভয়ে বনজুড়ে বিচরণ করছে।