ভারতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে করা একটি ইনস্টাগ্রাম পোস্ট ঘিরে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে মালয়ালম অভিনেত্রী, টেলিভিশন উপস্থাপক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয় মুখ পার্ল মানি। একদল নেটিজেন তাঁর মন্তব্যকে সংবেদনশীল সময়ে দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে সমালোচনা করেছেন, অন্যদিকে তাঁর সমর্থকেরা বলছেন, অভিনেত্রী তাঁর ব্যক্তিগত মতপ্রকাশের অধিকারই ব্যবহার করেছেন। তবে এটি প্রথম নয়; পার্ল মানির দীর্ঘ ক্যারিয়ারে সাফল্যের পাশাপাশি বিতর্কও কম আসেনি। কখনো রিয়েলিটি শোর ঘটনা, কখনো ব্যক্তিগত সম্পর্ক, আবার কখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বক্তব্য—বারবারই খবরের শিরোনামে উঠে এসেছে তাঁর নাম।
পার্ল মানির জন্ম ১৯৮৯ সালের ২৮ মে, কেরালার আলাপ্পুঝায়। ছোটবেলা থেকেই গান, নাচ ও মঞ্চে পারফর্ম করার প্রতি আগ্রহ ছিল তাঁর। পড়াশোনা শেষে করপোরেট চাকরিতে যোগ দিলেও খুব দ্রুত বুঝতে পারেন, তাঁর আসল জায়গা বিনোদনজগৎ। সেই উপলব্ধি থেকেই টেলিভিশনে উপস্থাপক হিসেবে যাত্রা শুরু করেন তিনি। প্রাণবন্ত উপস্থাপনা, স্বতঃস্ফূর্ত কথাবার্তা এবং দর্শকদের সঙ্গে সহজে যোগাযোগ তৈরি করার ক্ষমতা তাঁকে অল্প সময়েই জনপ্রিয় করে তোলে। মালয়ালম টেলিভিশনের বিভিন্ন বিনোদন অনুষ্ঠান, পুরস্কার বিতরণী এবং বিশেষ আয়োজনে নিয়মিত মুখ হয়ে ওঠেন তিনি। পরে বড় পর্দা ও ছোট পর্দা—দুই জায়গাতেই অভিনয়ের সুযোগ পান, যদিও অভিনয়ের চেয়ে উপস্থাপক ও ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতা হিসেবেই তাঁর পরিচিতি বেশি।
ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব ও ফেসবুকে পার্ল মানির অনুসারীর সংখ্যা কয়েক মিলিয়ন। ভ্রমণ, পারিবারিক জীবন, ফ্যাশন, দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা এবং মোটিভেশনধর্মী ভিডিও নিয়মিত প্রকাশ করেন তিনি। বিশেষ করে স্বামী অভিনেতা শ্রীনিশ অরবিন্দ ও দুই মেয়েকে নিয়ে তৈরি ভিডিও ও ভ্লগ ব্যাপক জনপ্রিয়। ভারতের আঞ্চলিক তারকাদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে সবচেয়ে সফলভাবে ব্যবহার করা ব্যক্তিদের একজন হিসেবে তাঁকে ধরা হয়। বিজ্ঞাপন, ব্র্যান্ড সহযোগিতা এবং ডিজিটাল কনটেন্ট থেকেও তিনি উল্লেখযোগ্য জনপ্রিয়তা ও বাণিজ্যিক সাফল্য পেয়েছেন।
২০১৮ সালে 'বিগ বস মালয়ালম'-এর প্রথম আসরে অংশ নেওয়ার পর পার্ল মানির জনপ্রিয়তা নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়। ওই অনুষ্ঠানেই তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী অভিনেতা শ্রীনিশ অরবিন্দর সঙ্গে বন্ধুত্ব প্রেমে রূপ নেয়। ২০১৯ সালে তাঁরা বিয়ে করেন এবং পরবর্তীতে তাঁদের সংসারে দুটি কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। রিয়েলিটি শো থেকে শুরু হওয়া এই প্রেমের গল্প ভক্তদের কাছে আজও আলোচিত।
তবে ক্যারিয়ারে বড় বিতর্ক তৈরি হয় ২০২১ সালে। জনপ্রিয় ইউটিউবার ও ব্লগার বিজয় পি নায়ার এক অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে গ্রেপ্তার হলে অভিযোগ ওঠে, তাঁকে মারধর ও অপদস্থ করার ঘটনায় পার্ল মানিও যুক্ত ছিলেন। পরে পুলিশ তাঁকেও আটক করে এবং আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়। এক পক্ষের দাবি ছিল, অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল; অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, আইনের বাইরে গিয়ে কাউকে শাস্তি দেওয়ার অধিকার কারও নেই। এই ঘটনাটি পার্ল মানির ভাবমূর্তিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।
পার্ল মানি বরাবরই সামাজিক নানা বিষয়ে নিজের মতপ্রকাশ করেন। কখনো নারীর অধিকার, কখনো সামাজিক বৈষম্য, আবার কখনো জনজীবনের বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে পোস্ট করেছেন তিনি। তবে সাম্প্রতিক বিতর্কের সূত্র হলো ২৪ জুলাই শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে তাঁর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে করা একটি দীর্ঘ পোস্ট। এই মন্তব্যের পর অনেকেই অভিযোগ করেন, সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে তাঁর অবস্থান স্পষ্ট নয় এবং আরও সতর্ক থাকা উচিত ছিল। বিপরীতে তাঁর সমর্থকরা একে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হিসেবে দেখছেন।
এই পোস্টের প্রভাব পড়েছে তাঁর অনুসারীর সংখ্যায়। পোস্টটি প্রকাশের সময় তাঁর অনুসারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ২৭ লাখ, যা ২৬ জুলাই নেমে আসে প্রায় ২৪ লাখে। ব্যাপক সমালোচনার মুখে তিনি ওই পোস্টের কমেন্ট সেকশন বন্ধ করে দিলেও অন্য পোস্টগুলোতে সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে।
বিতর্কের বাইরেও পার্ল মানি বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগে অংশ নেন এবং অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য দেন। মা হওয়ার অভিজ্ঞতা, মানসিক স্বাস্থ্য, কর্মজীবন ও পারিবারিক ভারসাম্য নিয়ে তিনি নিয়মিত কথা বলেন। তাঁর ইউটিউব চ্যানেলে পরিবারকেন্দ্রিক কনটেন্ট ভক্তদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়।