চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশে ২৫৭টি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ। ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত এই সময়ে মোট ২৬১ জন মানুষ সাম্প্রদায়িক সহিংসতার শিকার হয়েছেন।

সোমবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটি এই তথ্য প্রকাশ করে। তারা জানায়, দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকা, সংবাদমাধ্যম এবং নিজস্ব সূত্রে এই তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে ঐক্য পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ জানান, গত ৬ মাসে ৪০টি পৃথক ঘটনায় ৪৪ জন মানুষ হত্যার শিকার হয়েছেন। এছাড়া নারী নির্যাতন, ধর্ষণ বা সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে পাঁচটি। ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে ৬২টি এবং উপাসনালয়ের জমি দখলের ঘটনা ঘটেছে ১৫টি। বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ৪৭টি, অপহরণ, চাঁদা দাবি ও নির্যাতনের ঘটনা ১০টি এবং ধর্ম অবমাননার অভিযোগে গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ৯টি। এছাড়া জোরপূর্বক দখলের ঘটনা ২১টি এবং অন্যান্য ঘটনা ছয়টি ঘটেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু এবং ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের কাছে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি আট দফা দাবি জানিয়েছে ঐক্য পরিষদ। জরুরি পদক্ষেপের বিষয়ে তারা বলেছে, উসকানিমূলক ও ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক বক্তব্য এবং গুজব ছড়ানোকে বিশেষ ক্ষমতা আইনে ‘ক্ষতিকর কাজ’ গণ্য করে জড়িতদের শাস্তি দিতে হবে এবং তাদের নির্বাচনে প্রার্থিতা তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল করতে হবে। পাশাপাশি সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষদের ‘অধিকতর ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী’ হিসেবে বিবেচনা করে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করার আহ্বান জানানো হয়।

সংগঠনটির ৮ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—‘সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন’ প্রণয়ন, জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন ও সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয় গঠন, অর্পিত সম্পত্তি আইনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে রায় অনুযায়ী প্রকৃত মালিকদের জমি দ্রুত ফেরত দেওয়া, সংসদে সংখ্যালঘুদের জন্য সরাসরি ভোটে ৬০টি আসন সংরক্ষণ, বৈষম্য বিলোপ আইন প্রণয়ন, পার্বত্য চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়ন এবং দুর্গাপূজায় ৩ দিন, প্রবারণা পূর্ণিমায় ১ দিন ও ইস্টার সানডেতে ১ দিন সরকারি ছুটি প্রদান।

সংবাদ সম্মেলনে ঐক্য পরিষদের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য রঞ্জন কর্মকার বলেন, একটি অস্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ দেশ তাঁদের চাওয়া। সাম্প্রদায়িক কোনো শক্তির কারণে ধর্মীয় অনুভূতি আঘাত পাক, সেটা তাঁরা চান না।

অন্যদিকে, সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের বিষয়ে সরকারের প্রতি আস্থা প্রকাশ করেন ঐক্য পরিষদের অন্যতম সভাপতি নির্মল রোজারিও। তিনি বলেন, ‘আমরা শান্তি চাই। প্রতিনিয়ত আন্দোলন করতে আমাদের ভালো লাগে না। কিন্তু সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের ঘটনা যদি এভাবে চলতে থাকে, তাহলে বড় কর্মসূচি ঘোষণা করতে আমরা বাধ্য হব। আমরা দেখতে চাই, সরকার সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করবে। সরকারের ওপর সেই আস্থা আমাদের আছে।’

সংবাদ সম্মেলনটি সঞ্চালনা করেন ঐক্য পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক দীপঙ্কর ঘোষ। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজল দেবনাথ, সুনন্দ প্রিয় ভিক্ষু প্রমুখ। এছাড়া সরকারি অনুষ্ঠানে সব ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ করার জন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছে ঐক্য পরিষদ।