চট্টগ্রাম মহানগর ও বিভাগের সাত জেলায় পুলিশের তৈরি অস্ত্রধারীদের তালিকার চেয়ে তালিকার বাইরে থাকা সন্ত্রাসীর সংখ্যাই বেশি। অনুসন্ধানে জানা গেছে, অন্তত ১৩৯ জন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীর তথ্য পাওয়া গেছে যাদের নাম পুলিশের ‘শুটার’ তালিকায় নেই। এর মধ্যে শুধু চট্টগ্রাম মহানগরেই তালিকার বাইরে রয়েছেন অন্তত ৮৫ জন। অথচ এই মহানগরে পুলিশের তালিকায় ‘শুটার’ হিসেবে নাম রয়েছে মাত্র ৯ জনের।
গত ফেব্রুয়ারিতে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) উদ্যোগে সারা দেশের অস্ত্রধারীদের একটি তালিকা করা হয়। ওই তালিকায় মোট ২৪৩ জনের নাম, তাদের বিরুদ্ধে থাকা মামলা এবং তারা কারাগারে নাকি জামিনে—সেই সব তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়। চট্টগ্রাম মহানগর ও বিভাগের সাত জেলার তালিকায় ছিল ১০৯ জনের নাম। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তালিকার বাইরে আরও অনেক অস্ত্রধারী সক্রিয় রয়েছেন।
এই অসম্পূর্ণ তালিকার ফলে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুলিশের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, তালিকা অসম্পূর্ণ হলে অভিযানও অসম্পূর্ণ থেকে যায়, যার ফলে চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী ও রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়া অপরাধীরা সহজেই ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকতে পারেন।
চট্টগ্রাম মহানগরে পুলিশের তালিকায় থাকা ৯ জন হলেন—মোবারক হোসেন ওরফে ইমন, মো. রায়হান, মোহাম্মদ বোরহান উদ্দিন, বাদশা ওরফে ছোট বাদশা, মো. আলাউদ্দিন, মো. হেলাল ওরফে মাছ হেলাল, মো. নজরুল ইসলাম সোহেল, শহীদুল ইসলাম ও নুরে আলম সোহাগ। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের তথ্যমতে, এই ৯ জনের বাইরে নগরের বিভিন্ন এলাকায় আরও অন্তত ৮৫ জন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী সক্রিয় রয়েছেন, যাদের বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি, অস্ত্র, মাদক ও আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে।
তালিকায় থাকা শহীদুল ইসলাম চুরি-ছিনতাইয়ের মাধ্যমে অপরাধজগতে প্রবেশ করে পরে মাদক কারবারে জড়িয়ে নিজস্ব বাহিনী গড়ে তোলেন। ‘কিশোর গ্যাং’ নেতা হিসেবে পরিচিত এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে অস্ত্র, চাঁদাবাজি ও মাদকসহ ২৩টি মামলা রয়েছে। গত বছরের ২১ ডিসেম্বর র্যাব তাকে গ্রেপ্তার করলেও পুলিশ কর্মকর্তাদের দাবি, তার বাহিনীর সদস্যরা এখনো নগরের বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয়।
অন্যদিকে, মোবারক হোসেন ওরফে ইমনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, অস্ত্র ও খুনের আটটি মামলা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে চাঁদা দাবি করেন এবং সম্প্রতি এক সাংবাদিকের কাছে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া তালিকাভুক্ত মো. রায়হানের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও হত্যার ১৩টি মামলা থাকলেও তাকে এখনো গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে হামলা ও গুলিবর্ষণের অভিযোগে পুলিশ ৪৬ জনকে শনাক্ত করেছে, যাদের মধ্যে ২০ জনকে র্যাব ও পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। তবে অবাক করা বিষয় হলো, এই ৪৬ জনের কারও নামই পুলিশের বিশেষ শাখার ‘শুটার’ তালিকায় নেই। মুরাদপুর, বহদ্দারহাট ও নিউমার্কেট এলাকায় প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে গুলি চালানোর ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছিল, যাতে ১৫ জন নিহত হন। ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে তাদের শনাক্ত করা হলেও তালিকায় নাম না থাকায় প্রশ্ন উঠেছে।
চট্টগ্রাম বিভাগের সাত জেলায় পুলিশের তালিকায় ১০০ জনের নাম থাকলেও অনুসন্ধানে আরও অন্তত ৫৪ জন অস্ত্রধারীর তথ্য পাওয়া গেছে। বিশেষ করে ফেনীর তালিকায় দেখা গেছে, পুলিশের তালিকায় অস্ত্রধারী মাত্র পাঁচজন, অথচ অনুসন্ধানে আরও অন্তত ৩৩ জনের তথ্য পাওয়া গেছে। ২০২৪ সালের ৪ ও ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ওপর প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে হামলা চালানো এদের অনেকের মধ্যে স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের নাম রয়েছে। ফেনী জেলা পুলিশ জানিয়েছে, জুলাই আন্দোলনে অস্ত্র ব্যবহার করে হামলা চালানো ২৬ জনের একটি পৃথক তালিকা তৈরি করে পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
অন্যান্য জেলাতেও একই চিত্র দেখা গেছে। নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে অন্তত পাঁচজন অস্ত্রধারীর নাম তালিকার বাইরে রয়েছে, যাদের কয়েকজন সাবেক মেয়র আবদুল কাদের মির্জার অনুসারী বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১৮ জনের নাম থাকলেও আলোচিত শাকিল সিকদার ওরফে লায়নের নাম নেই। এছাড়া কুমিল্লা ও লক্ষ্মীপুরেও তালিকার বাইরে অস্ত্রধারীদের তথ্য পাওয়া গেছে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কারা অস্ত্রধারী বা কারা চাঁদাবাজি করে সে বিষয়ে পুলিশের অজানা থাকার কথা নয়, তবে তাদের গ্রেপ্তারে কার্যকর ভূমিকার অভাব রয়েছে। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক পরিচয় ও আশ্রয়ের কারণে অনেক অস্ত্রধারী সক্রিয় থাকতে পারেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান সহকারী অধ্যাপক মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, "তালিকা ভুল হলে সমস্যার গোড়াতেই গলদ থাকে। তালিকা অসম্পূর্ণ হলে অভিযানও অসম্পূর্ণ হবে। ফলে অস্ত্রধারী, চাঁদাবাজ ও রাজনৈতিক আশ্রয়প্রাপ্ত অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যেতে পারেন।"
তিনি আরও বলেন, "ত্রুটিপূর্ণ তালিকা তৈরির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি। একই সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য, মামলা, ভিডিও ফুটেজ ও স্থানীয় পর্যায়ের তথ্য সমন্বয় করে তালিকাটি নিয়মিত হালনাগাদ করা প্রয়োজন।"
পুলিশের দাবি, অস্ত্রধারীদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং তালিকায় নাম থাকুক বা না থাকুক, অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে বিপুলসংখ্যক অস্ত্রধারীর নাম তালিকার বাইরে থাকায় পুলিশের তথ্যের পূর্ণতা ও কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।