বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোর মূলে রয়েছে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থার উত্তরাধিকার, যার মূল দর্শন ছিল নিরপেক্ষ আমলাতন্ত্র। তবে যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘকাল ধরে 'স্পয়েলস সিস্টেম' বা দলীয় অনুগত ব্যক্তিদের সরকারি পদে বসানোর একটি ধারা প্রচলিত। বর্তমানে বাংলাদেশেও নিরপেক্ষ আমলাতন্ত্রের পরিবর্তে এই স্পয়েলস সিস্টেমের প্রবণতা বাড়ছে বলে মনে হচ্ছে এবং সাম্প্রতিক কিছু নিয়োগ সেই ধারারই প্রতিফলন বলে প্রতীয়মান হয়।

পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি)-এর নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান মনে করেন, এখানে মূল বিতর্ক আমলা বনাম রাজনীতিবিদদের নিয়ে হওয়া উচিত নয়। তিনি বলেন, "তবে এখানে মূল প্রশ্ন—কোনো পদে আমলা বসানো হচ্ছে, নাকি রাজনৈতিক ব্যক্তিকে বসানো হচ্ছে, সেটি নয়; বরং দেখতে হবে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর ও গতিশীল করতে সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি কে।"

বাস্তবতা হলো, যেসব প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, সেগুলোর অনেকগুলোই দীর্ঘ সময় আমলাদের নেতৃত্বে থেকেও প্রত্যাশিত গতিশীলতা অর্জন করতে পারেনি। তাই কেবল আমলাদের ফিরিয়ে আনলেই সমস্যার সমাধান হবে না। মূল সমস্যাটি হলো দক্ষতা ও পেশাদারত্বের চেয়ে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীভিত্তিক বিবেচনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া। নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি আমলা হোন বা রাজনীতিবিদ, প্রশ্নটি হওয়া উচিত তিনি সংশ্লিষ্ট পদের জন্য সবচেয়ে যোগ্য কি না।

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক নেতাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। হোসেন জিল্লুর রহমানের মতে, এসব নিয়োগ যদি কেবল রাজনৈতিক পুরস্কার হিসেবে বিবেচিত হয়, তবে কাঙ্ক্ষিত প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন আসবে না। সরকারের উচিত ছিল প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করার উদ্যোগের কথা ঘোষণা করে একটি স্বচ্ছ ও পরামর্শভিত্তিক প্রক্রিয়ায় যোগ্য ব্যক্তিদের নির্বাচন করা। এতে রাজনৈতিক পদায়নের পরিবর্তে প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার উদ্দেশ্য স্পষ্ট হতো।

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, আমলাতন্ত্র এবং রাজনৈতিক অঙ্গন—উভয় ক্ষেত্রেই সৎ, দক্ষ ও পেশাদার ব্যক্তি রয়েছেন। তাই বিতর্কটি হওয়া উচিত যোগ্য বনাম অযোগ্যর। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর একটি দক্ষ, মানবিক ও আধুনিক রাষ্ট্রের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে এই লক্ষ্য অর্জনে এখনো দীর্ঘ পথ বাকি।

অনেকের মতে, নিয়োগ সংক্রান্ত আইন পরিবর্তন করা প্রয়োজন। তবে হোসেন জিল্লুর রহমানের মতে, সমস্যা আইনে নয়, বরং আইনের প্রয়োগে। আইন সরকারকে সুযোগ দিলেও সেই সুযোগের ব্যবহার নির্ভর করে রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও শাসনব্যবস্থার মানসিকতার ওপর। তিনি সতর্ক করে বলেন, দক্ষতা ও পেশাদারত্বের সংস্কৃতি গড়ে না তুললে কেবল আমলা বা রাজনীতিবিদের অদলবদল করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা বাড়ানো সম্ভব নয়। তাঁর মতে, "রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যক্তি নয়, যোগ্যতা ও স্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়াই হওয়া উচিত সবচেয়ে বড় বিবেচ্য বিষয়।"