যশোরের কেশবপুর সরকারি ডিগ্রি কলেজে চরম শিক্ষকসংকটের কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। রসায়ন ও কৃষিশিক্ষা বিষয়ে কোনো স্থায়ী শিক্ষক না থাকায় বিকল্প উপায়ে পাঠদান চালানো হচ্ছে। এছাড়া শ্রেণিকক্ষের অপ্রতুলতা ও অবকাঠামোগত সংকটে জর্জরিত এই প্রতিষ্ঠানটি।

কলেজ সূত্রে জানা গেছে, এখানে রসায়ন বিষয়ে দুটি পদ থাকলেও কোনো স্থায়ী শিক্ষক নেই। ফলে এইচএসসি ও স্নাতক (ডিগ্রি) পর্যায়ের প্রায় তিন শ শিক্ষার্থীকে খণ্ডকালীন একজন শিক্ষকের মাধ্যমে রসায়ন পড়তে হচ্ছে। একইভাবে কৃষিশিক্ষা বিষয়ে দুজন শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় ভূগোল বিভাগের শিক্ষকরা এই বিষয়টি পড়ান। অন্যদিকে, ইংরেজি বিষয়ে তিনজন শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে মাত্র একজন স্থায়ী শিক্ষক ৪ হাজার ২৫১ শিক্ষার্থীর ক্লাস নিচ্ছেন। এই চাপ সামলাতে একজন খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ করা হয়েছে।

শিক্ষকসংকটের ফলে শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগের কথা জানান দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী নাজমুছ সাকিব। তিনি বলেন, "তাদের কৃষিশিক্ষা বিষয়ে ক্লাস নেন ভূগোল বিভাগের শিক্ষক। বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক না থাকায় তাদের খুব অসুবিধা হচ্ছে।"

পাঠদানের চাপে হিমশিম খাচ্ছেন ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক আবু নাসের বিপ্লব। তিনি বলেন, "ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অনেক ক্লাস নিতে পারেন না। একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ক্লাস নিলে পাঠদান সঠিকভাবে হয় না। খণ্ডকালীন এক শিক্ষক আছেন, তিনি ক্লাস নেন। তিনি খণ্ডকালীন বলে তাঁর এতটা দায় থাকে না।"

ভূগোল বিভাগের বিভাগীয় প্রধান এনায়েত হোসেন, যিনি ছয় মাস পর অবসরে যাবেন, তিনি জানান যে ভূগোল বিভাগের শিক্ষক হয়েও তাকে কৃষিশিক্ষা পড়াতে হচ্ছে। এনায়েত হোসেন বলেন, "এখন দুটি বিষয়ে পড়াতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের মতো রাত জেগে নিজেকে পড়তে হচ্ছে। নিজে পড়ে রপ্ত করে তারপর ক্লাসে যেতে হচ্ছে। এতে তাঁর জন্য বাড়তি চাপ হয়ে যাচ্ছে।"

কলেজটির ইতিহাস বিভাগের প্রধান আবদুল হান্নান জানান, প্রতিষ্ঠানটি সরকারি হলেও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে শ্রেণিকক্ষের তীব্র সংকট রয়েছে। তিনি বলেন, "প্রতিষ্ঠানটি সরকারি হয়েছে। কিন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠানের কোনো সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না। কলেজের সবচেয়ে বড় সংকট শ্রেণিকক্ষ। একটি পুরোনো ভবনে শিক্ষার্থীদের ক্লাস নেওয়া হয়। ভূগোল বিভাগের ওপর ছাদ দিয়ে চুইয়ে চুইয়ে পানি পড়ে। একটু বৃষ্টিতেই ভবনে পানি উঠে যায়, তখন শিক্ষার্থীরা ক্লাসে বসতে পারেন না। সরকারি হওয়ার পরে মন্ত্রণালয়ে অবকাঠামোর প্রয়োজনের কথা জানালেও এখন পর্যন্ত কোনো ভবন নির্মাণ করা হয়নি।"

নতুন ভবন নির্মাণের বিষয়ে যশোরের শিক্ষা প্রকৌশলী ইলিয়াস আলী জানান, ছয়তলা ভবন নির্মাণের প্রস্তাব শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের কাছে পাঠানো হয়েছে এবং প্রস্তাবটি পাস হলে নির্মাণ কাজ শুরু হবে।

১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কলেজটি ২০১৮ সালের আগস্ট মাসে সরকারি করা হয়। বর্তমানে ৮ একর ২৭ শতক জমির ওপর অবস্থিত এই কলেজে মোট ৬৫ জন শিক্ষক কর্মরত থাকলেও ১১ জনের ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া প্রশাসনিক কাজে মাস্টার রোলে ১৬ জনকে নিয়োগ দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে।

কলেজের অধ্যক্ষ আসাদুজ্জামন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "এই প্রতিষ্ঠান নামে সরকারি হয়েছে। নানা সংকটের বিষয়ে বারবার মন্ত্রণালয়ে জানিয়েও কোনো প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না। কলেজে তেমন কোনো তহবিল নেই। তারপরও টাকা দিয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষক দিয়ে পাঠদান চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে। মাস্টার রোলে তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের বেতন দিয়ে কাজ করাতে হচ্ছে।"

তিনি আরও উল্লেখ করেন, "নতুন জাতীয়করণ কলেজগুলোয় শিক্ষক নিয়োগের নীতিমালা চূড়ান্ত হয়নি। ফলে শিক্ষক নিয়োগে জটিলতা রয়েছে।"