মুক্তিযুদ্ধের অর্জন যেভাবে জনগণের হাতছাড়া হয়েছিল, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ক্ষেত্রেও সেই অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি ঘটছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। তাঁর মতে, জনগণ যে অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিল, তা কেড়ে নিয়ে উল্টো পথে যাত্রার এক ভয়াবহ প্রচেষ্টা চলছে।
রোববার বিকেলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় কারফিউ ভেঙে বের হওয়া গানের মিছিলের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক সাংস্কৃতিক সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন। গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের আয়োজনে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, "গণ-অভ্যুত্থানে অত্যাচারী শাসকের পতন ঘটলেও গণতান্ত্রিক রূপান্তরের যে আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশা ছিল, তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।"
জুলাই আন্দোলনে শিল্পী, লেখক ও সংস্কৃতিকর্মীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, গানের মিছিল ছিল বৃহত্তর প্রতিরোধ সংগ্রামের এক সাংস্কৃতিক প্রকাশ। তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সংস্কৃতি অঙ্গনের একটি অংশ দীর্ঘকাল শাসকের কাছে আত্মসমর্পণ করলেও অনেক শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মী স্বাধীন অবস্থান বজায় রেখে হত্যাকাণ্ড ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছিলেন, যা গণ-অভ্যুত্থানের শক্তিকে আরও বিস্তৃত করেছিল।
তবে অভ্যুত্থানের পর পরিস্থিতি প্রত্যাশিত পথে এগোয়নি বলে মন্তব্য করেন ওই অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, "আন্দোলনের মূল বার্তা ছিল সব মানুষের অধিকার, বৈষম্যহীনতা ও গণতান্ত্রিক রূপান্তর। কিন্তু পরবর্তী সময়ে নারী, আদিবাসী, শিল্পী, লেখক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে।"
তিনি আরও বলেন, "গণ-অভ্যুত্থানের যে শক্তি সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক বিকাশের পথ সুগম করার কথা ছিল, তার বিপরীত প্রবণতাই দৃশ্যমান হয়েছে।"
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ অভিযোগ করেন, লিঙ্গ, ধর্ম ও জাতিগত বৈষম্যের ভিত্তিতে রাজনীতি করা গোষ্ঠীগুলো এখন প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে, যার ফলে মনে হচ্ছে তারাই যেন গণ-অভ্যুত্থানের মালিক। তিনি বলেন, "গণ-অভ্যুত্থানকে হাতছাড়া করার এই প্রচেষ্টার ধারাবাহিকতায় অন্তর্বর্তী সরকার জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। পরবর্তী নির্বাচিত সরকারও বিভিন্ন বিষয়ে নীরব সম্মতি দিয়ে যাচ্ছে।"
অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের দিনগুলোতে মানুষ নির্দিষ্ট কোনো পরিচয়ের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে নয়, বরং নিপীড়ন ও হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী নাগরিক হিসেবে রাস্তায় নেমেছিলেন। তিনি মনে করেন, জুলাইয়ে গণহত্যার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি পরবর্তী সময়ের অন্যায়-অনিয়মের বিরুদ্ধেও শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের প্রতিবাদ অব্যাহত রাখা প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে স্বৈরাচারী শাসনের পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের আহ্বায়ক জামসেদ আনোয়ার তপনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিবর্তন সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান লালটু লিখিত বক্তব্য দেন। এছাড়া সমাজ চিন্তা ফোরামের আহ্বায়ক কামাল হোসেন বাদল এবং গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য রাফিকুজ্জামান ফরিদ প্রমুখ সমাবেশে বক্তব্য রাখেন।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে শিল্পী সায়ান, হাসান ফখরি, দীপক সুমন, মাহমুদুল হাসান ও কামরুজ্জামান ভূঁইয়া আবৃত্তি করেন। একক সংগীত পরিবেশন করেন লায়েকা বশীর এবং মূকাভিনয় করেন মুন্সি আবু হারুন টিটো। এছাড়া উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, বিবর্তন ও কোরাস ও সমগীতের শিল্পীরা দলগত সংগীত পরিবেশন করেন।