সারকোমা এক বিরল ধরনের ক্যানসার, যা শরীরের হাড়, মাংসপেশি, চর্বি, রক্তনালি, স্নায়ুর আশপাশের টিস্যু কিংবা শরীরের গভীর নরম অংশ থেকে উৎপন্ন হতে পারে। হাত-পা, পেট, বুকসহ শরীরের যেকোনো স্থানেই এই রোগ দেখা দিতে পারে। বিরল হলেও সময়মতো শনাক্ত না হলে এর চিকিৎসা অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়ে। এই বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে জুলাই মাসকে 'সারকোমা সচেতনতা মাস' হিসেবে পালন করা হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীরের কোনো গোটা বা ফোলা যদি দ্রুত বড় হতে থাকে, আকার ৫ সেন্টিমিটারের বেশি হয়, চামড়ার গভীরে থাকে, ব্যথা করে কিংবা বারবার ফিরে আসে, তবে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। এছাড়া দীর্ঘদিনের হাড়ের ব্যথা, চলাফেরায় সমস্যা বা কোনো আঘাত ছাড়াই হাড় ভেঙে যাওয়াও সারকোমার গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে নিজে নিজে ওষুধ সেবন, মালিশ করা বা গোটা কেটে ফেলা একেবারেই উচিত নয়।

সন্দেহজনক গোটা আগে কেটে ফেলে পরে পরীক্ষা করা সারকোমার ক্ষেত্রে একটি বড় ভুল হতে পারে। এতে পরবর্তী অস্ত্রোপচার, রেডিওথেরাপি বা অন্যান্য চিকিৎসা পদ্ধতি জটিল হয়ে যায়। তাই যেকোনো গোটা দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং অস্ত্রোপচারের আগে সঠিক পরীক্ষা ও পরিকল্পিত বায়োপসি করা জরুরি।

রোগ নির্ণয়ের প্রক্রিয়ায় প্রথমে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রোগীকে পরীক্ষা করেন। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী এমআরআই, সিটি স্ক্যান, এক্স-রে, বোন স্ক্যান বা পেট সিটি স্ক্যান করা হয়। নরম টিস্যু সারকোমা শনাক্তকরণে এমআরআই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মাধ্যমে টিউমারের আকার, অবস্থান এবং আশপাশের স্নায়ু, রক্তনালি ও মাংসপেশির সঙ্গে এর সম্পর্ক বোঝা যায়। এছাড়া ফুসফুসে রোগ ছড়িয়েছে কি না তা যাচাই করতে বুকের সিটি স্ক্যান করা হয়।

সারকোমা নিশ্চিত করার প্রধান পরীক্ষা হলো বায়োপসি। এক্ষেত্রে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে 'ইমেজ গাইডেড কোর নিডল বায়োপসি' সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি। শুধু এফএনএসি বা সুচ ঢুকিয়ে পরীক্ষা অনেক সময় যথেষ্ট হয় না। বায়োপসির টিস্যু থেকে হিস্টোপ্যাথলজি করা হয় এবং প্রয়োজনে আইএইচসি, মলিকুলার টেস্ট বা জেনেটিক টেস্ট করা হয়, যাতে সারকোমার নির্দিষ্ট ধরন ও গ্রেড জানা যায়।

সারকোমার চিকিৎসার জন্য একটি সমন্বিত টিমের প্রয়োজন। সার্জন, রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, মেডিক্যাল অনকোলজিস্ট, রেডিওলজিস্ট ও প্যাথলজিস্ট একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নিলে চিকিৎসার ফল ভালো হয়। অনেক ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারই প্রধান চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে টিউমারের ধরন, আকার ও ঝুঁকির ওপর ভিত্তি করে অস্ত্রোপচারের আগে বা পরে রেডিওথেরাপি দেওয়া হয়। রেডিওথেরাপি টিউমার নিয়ন্ত্রণে, অস্ত্রোপচারের ফলাফল উন্নত করতে এবং হাত-পায়ের কার্যক্ষমতা রক্ষা করতে সাহায্য করে। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে কেমোথেরাপি বা টার্গেট থেরাপির প্রয়োজন হতে পারে বলে জানান ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ডা. আরমান রেজা চৌধুরী, এভারকেয়ার হাসপাতাল, ঢাকা।