মহেশখালীর এক্সিলারেট এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের ফলে চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে শিল্পকারখানা, ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং আবাসিক খাতের ওপর। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমে যাওয়ায় কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) এসব খাতে গ্যাসের চাপ কমিয়ে দিয়েছে, যার ফলে নগরের বিভিন্ন এলাকায় তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। অনেক এলাকায় দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রান্নার চুলা জ্বলছে না এবং শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

কেজিডিসিএলের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, গত শুক্রবার সকাল আটটা থেকে শনিবার সকাল আটটা পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি ২২ কোটি ৩০ লাখ ঘনফুট গ্যাস পেয়েছে, যা মোট চাহিদার মাত্র ৭০ শতাংশ। ওই সময়ে মোট চাহিদা ছিল প্রায় ৩৫ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ দৈনিক চাহিদার তুলনায় প্রায় সাড়ে ১২ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহের জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে—একটি মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি এবং অন্যটি সামিট এলএনজি টার্মিনাল দ্বারা পরিচালিত। চট্টগ্রামের গ্যাস সরবরাহ মূলত এই দুই টার্মিনালের ওপর নির্ভরশীল। গত মঙ্গলবার মার্কিন এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর সেখান থেকে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়, যার সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রামে।

এই টার্মিনালটি পরিচালনা করে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল)। কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, অগ্নিকাণ্ডের আগে দুটি টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০৫ কোটি ঘনফুট এলএনজি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হতো, যা বর্তমানে প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। আরপিজিসিএলের মহাব্যবস্থাপক মো. শফিকুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটি মেরামত করে চালু করার জন্য দেশি ও বিদেশি দল কাজ করছে। যত দ্রুত সম্ভব কার্যক্রম শেষ হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।"

সংকট মোকাবিলায় শিল্প ও ক্যাপটিভ পাওয়ারে গ্যাসের চাপ কমানো হয়েছে। কেজিডিসিএলের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে শিল্প ও ক্যাপটিভ পাওয়ারে চাপ কমানো হয়েছে। দিনে ২৫ থেকে ২৮ কোটি ঘনফুট গ্যাস পেলেও পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যেত। কিন্তু এখন ২২ থেকে ২৩ কোটি ঘনফুটের বেশি পাওয়া যাচ্ছে না। তবে মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল চালু হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।"

আবাসিক গ্রাহকদের ভোগান্তি চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। বহদ্দারহাট এলাকার বাসিন্দা উম্মে সাদিয়া মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "কয়েক দিন ধরেই তাঁদের বাসায় গ্যাসের চাপ কম ছিল। গত বুধবার দুপুরের পর সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। সন্ধ্যার পর গ্যাস এলেও চাপ ছিল খুবই কম। এর পর থেকে প্রতিদিন একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। রান্না, শিশুদের খাবার তৈরি এবং পানি ফোটানোর মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজ ব্যাহত হচ্ছে।"

কেজিডিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. সালাহউদ্দিন মুক্তকণ্ঠকে জানান, মহেশখালীতে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে সরবরাহ কমেছে, তবে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে তাঁরা কাজ করে যাচ্ছেন। অন্যদিকে, কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক মু. রইস উদ্দিন আহমেদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “টার্মিনাল বন্ধ থাকায় গ্যাসের সংকট দেখা দিয়েছে। শিকলবাহা বিদ্যুৎকেন্দ্র ও কাফকো সার কারখানা কম গ্যাস নিচ্ছে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আমরা কম গ্যাস নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছি।”

কেজিডিসিএলের হিসাব অনুযায়ী, চট্টগ্রামে মোট গ্রাহক ১ লাখ ৪৬ হাজার ১৭৪ জন। এর মধ্যে ক্যাপটিভ পাওয়ারের গ্রাহক ২০৪ এবং শিল্পগ্রাহক ৯৬২ জন। বাকিরা বিদ্যুৎ, সার, বাণিজ্যিক ও আবাসিক খাতের গ্রাহক। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, সংকট দীর্ঘায়িত হলে শিল্পকারখানার উৎপাদন এবং ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, কারণ চট্টগ্রামের অনেক প্রতিষ্ঠান নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এই গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। কর্মকর্তাদের মতে, আগে থেকেই চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম ছিল, যা এই অগ্নিকাণ্ডের ফলে আরও প্রকট হয়েছে।