বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদ থেকে শুরু করে সমকালীন কবিতা, গান এবং পাপেট শো—সব মিলিয়ে এক ব্যতিক্রমী ও উপভোগ্য অনুষ্ঠানের সাক্ষী থাকল বাংলা একাডেমি। শনিবার একাডেমির কবি আল মাহমুদ লেখক কর্নারে ‘এক রূপে বহুরূপী’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ভাবনগর ফাউন্ডেশন।

সকাল ১০টায় শুরু হওয়া অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বে ভাবনগর ফাউন্ডেশনের সাধক-শিল্পীরা পরিবেশন করেন চর্যাপদের গান। লুইপা রচিত প্রথম পদ ‘কাআ তরুবর পঞ্চবি ডাল’ পরিবেশন করেন সাধক শিল্পী শাহ আলম দেওয়ান, সাধিকা সৃজনী তানিয়া, বাউল অন্তর সরকার, শিলা মল্লিক, আনিস মুন্সী ও ফহেত কালাম। পরবর্তীতে সৃজনী তানিয়া একক কণ্ঠে গুণ্ডরীপা রচিত চতুর্থ পদ ‘তিঅড্ডা চাপী জোইনি দে অঙ্কবালী’ গেয়ে শোনান।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে সরল বাংলা অনুবাদে চর্যার একটি নতুন গান পরিবেশিত হয়। সমবেত কণ্ঠে সাধকেরা গেয়ে শোনান, “না বলো ভালো, না বলো মন্দ/ সকলে মিলে হলো যে সঙ্গ”।

অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ও ভাবনগর ফাউন্ডেশনের সভাপতি গবেষক সাইমন জাকারিয়া জানান, মার্কিন গবেষক ওয়েস্টিন হ্যারিস সম্প্রতি তিব্বতের বৌদ্ধ সাধুদের কাছ থেকে বীরূপা রচিত এই পদটি তিব্বতি ভাষায় আবিষ্কার করেছেন। ওয়েস্টিন হ্যারিসের ইংরেজি অনুবাদের পর সাইমন জাকারিয়া এটিকে সরল বাংলায় ভাষান্তর করেন এবং ভাবনগরের সাধকেরা এতে সুরারোপ করেন।

আয়োজকদের মতে, ২০১১ সালে চর্যাপদের পুনর্জাগরণের লক্ষ্য নিয়ে ভাবনগর ফাউন্ডেশনের যাত্রা শুরু হয়। আন্তর্জাতিক সেমিনার, গান পরিবেশনা ও সাধুসঙ্গের পাশাপাশি এখন তারা বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন দিক নিয়ে গবেষণা ও সৃজনশীল মাধ্যমকে অন্তর্ভুক্ত করছেন। সেই উদ্দেশ্যেই এবারের আয়োজনে সমকালীন কবিতা ও পাপেট শো যুক্ত করা হয়েছে।

গানের পর চট্টগ্রামের কবি রাজীব কুমার দাশের কবিতা নিয়ে প্রবন্ধ পাঠ, আলোচনা ও আবৃত্তি অনুষ্ঠিত হয়। তিন কাব্যগ্রন্থের লেখক রাজীব কুমার দাশের কবিতা প্রথমে আবৃত্তি করেন নুরুননবী শান্ত। এরপর তরুণ গবেষক হাসান দবির উদ্দিন ও শরণ এহসান তাঁর কবিতার ওপর প্রবন্ধ পাঠ করেন।

আলোচনায় অংশ নেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও কথাশিল্পী গওহর গালিব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও গবেষক জোবায়ের আবদুল্লাহ, বাংলা একাডেমির সহপরিচালক কবি আসাদ আহমেদ এবং কবি ও অনুবাদক শাহেদ কায়েস। আলোচকদের মতে, রাজধানীর বাইরে প্রান্তিক পর্যায়ে কাব্যচর্চায় রাজীব কুমার দাশ অন্যতম একজন ব্যক্তিত্ব, যিনি সমকালীন কবিতায় একটি স্বতন্ত্র স্বর প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখছেন।

নিজের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে কবি রাজীব কুমার দাশ বলেন, “কবিতা তাঁর জীবনের অনুষঙ্গ। ইতিহাস, পুরাণ ও সমকালীন বাস্তবতার ভেতর দিয়ে তিনি নিজেকে ও বর্তমান সময়কেও বোঝার চেষ্টা করেন।” এসময় তিনি তাঁর সদ্য রচিত একটি কবিতা পাঠ করেন।

অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটারের পরিবেশনায়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী ফাতেমা বিনি ও অর্ণব মল্লিকের পাপেট শোতে পরিবেশিত হয় বই পড়ার গান “চল চল আমরা বই পড়ি/ বইয়ের রাজ্যে ভেসে ভেসে স্বপ্নের জাল বুনি” এবং ‘ডাইনোসরের গান’। শিশু-কিশোরদের পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্ক দর্শকদের মাঝেও এই পরিবেশনা ব্যাপক প্রশংসা ও করতালির মধ্য দিয়ে শেষ হয়।