ছুটির দিন হওয়া সত্ত্বেও আজ শনিবার সকালে কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ প্রাঙ্গণে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন শতাধিক শিক্ষার্থী। জলাবদ্ধতার মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার ঘটনায় কলেজের সাত শিক্ষককে অন্যায়ভাবে বদলি করা হয়েছে বলে দাবি করে শিক্ষার্থীরা এই কর্মসূচি পালন করেন।
শিক্ষকদের বদলির প্রতিবাদে অবস্থান কর্মসূচি চলাকালে শিক্ষার্থীরা ‘শিক্ষকদের বদলি নয়, জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান করতে হবে’, ‘উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে, চলবে না চলবে না’, ‘শিক্ষকদের বদলি কেন, মাউশি জবাব চাই’, ‘শিক্ষকদের বদলির আদেশ, মানি না মানব না’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন।
বেলা সাড়ে ১১টার দিকে এক আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বদলি হওয়া সাত শিক্ষকের একজন, ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ মহসীন হঠাৎ সেখানে উপস্থিত হয়ে করজোড়ে শিক্ষার্থীদের মিনতি জানান এবং আন্দোলন বন্ধ করতে বলেন। তবে শিক্ষার্থীরা তাঁদের দাবিতে অনড় থাকেন। একপর্যায়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে মোহাম্মদ মহসীন শিক্ষার্থীদের বলেন, ‘সরকারি চাকরি করি। আমার বদলি হইছে। তোমরা আন্দোলন করে আমার চাকরিটা খাইও না। আমি পরিবার নিয়ে না খেয়ে মরব। তোমরা আমার সাথে আসো। আমার চাকরিটা থাকবে না।’
শিক্ষকের এমন আকুতিতে উপস্থিত শিক্ষার্থীরা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তাঁরা শিক্ষককে বাবার সঙ্গে তুলনা করে জানান, তাঁদের আন্দোলনের কারণে তাঁর চাকরির কোনো ক্ষতি হলে তাঁরা তা মেনে নেবেন না।
উল্লেখ্য, গত ১৩ জুলাই অতি ভারী বৃষ্টির কারণে কুমিল্লা নগরে চরম জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, ওই দিন সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত ১০৭ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়, যার ফলে প্রধান সড়কসহ অলিগলি হাঁটু থেকে কোমরসমান পানিতে তলিয়ে যায়। বিশেষ করে কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রের প্রায় এক হাজার এইচএসসি পরীক্ষার্থীকে চরম ভোগান্তির মধ্য দিয়ে পরীক্ষা দিতে হয়। অনেক শিক্ষার্থী ভেজা কাপড়েই তিন ঘণ্টা পরীক্ষা দিতে বাধ্য হন, যা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়।
এই ঘটনার ১০ দিন পর, ২৩ জুলাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সরকারি কলেজ–২ শাখার উপসচিব মো. আ. কুদদূস স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে সাত শিক্ষককে বদলি করা হয়। আদেশে তাঁদের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করে বিভিন্ন কলেজে সংযুক্ত করা হয়েছে, তবে বদলির কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি। বদলি হওয়াদের মধ্যে উপাধ্যক্ষ এ কে এম জহিরুল আলমকে চৌদ্দগ্রামের চিওড়া সরকারি কলেজে, গণিত বিভাগের অধ্যাপক মো. আবদুল মালেককে কক্সবাজার সরকারি কলেজে, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কনক বড়ুয়াকে নোয়াখালীর হাতিয়া দ্বীপ সরকারি কলেজে, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মুহাম্মদ উল্লাহ মজুমদারকে লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজে, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নূর মোহাম্মদ নূর উল্লাহকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর সরকারি কলেজে, হিসাববিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক মো. আল–আমিনকে সিলেটের বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজে এবং ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ মহসীনকে বরগুনা সরকারি কলেজে বদলি করা হয়েছে।
কলেজ সূত্রমতে, বদলি হওয়াদের মধ্যে অধ্যাপক মো. আবদুল মালেক ছিলেন পরীক্ষাকেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং সহযোগী অধ্যাপক কনক বড়ুয়া ছিলেন পরীক্ষা কমিটির আহ্বায়ক। উপাধ্যক্ষ এ কে এম জহিরুল আলম ওই সময় ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্বে থাকলেও পরীক্ষা ব্যবস্থাপনায় ছিলেন না, কারণ তাঁর ছেলে ওই কেন্দ্রের পরীক্ষার্থী ছিলেন। এছাড়া সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ মহসীন কলেজের শিক্ষক পরিষদের সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী তাফসিলা আজমির বলেন, ‘সেদিন জলাবদ্ধতা শুধু কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজেই হয়নি, সারা শহরই পানিতে তলিয়ে গেছে। জলাবদ্ধতা নিরসন করা শিক্ষকদের দায়িত্ব নয়, এটি সিটি করপোরেশনের কাজ। আমাদের কলেজের পাশেই কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড, তারা কি সেদিন জলাবদ্ধতা দেখেনি? তাহলে যারা জলাবদ্ধতা নিরসনে ব্যর্থ, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে কেন আমাদের সাত মেধাবী শিক্ষককে বলির পাঁঠা বানানো হয়েছে?’