মাগুরা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের মূল ফটকে কর্তৃপক্ষের টানানো একটি বোর্ডে লেখা—‘সব ধরনের পোস্টার লাগানো নিষেধ’। অথচ নিয়ম উপেক্ষা করে ঠিক পাশেই ঝুলছে পাঁচটি সাইনবোর্ড। কোথাও নববর্ষ বা ঈদের শুভেচ্ছা, আবার কোথাও আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে দোয়া ও সমর্থন চাওয়া হয়েছে। এসব বোর্ডের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে জেলা লিগ্যাল এইড কমিটির তথ্যবহুল বিলবোর্ড। ফটকের অপর পাশেও একই চিত্র পরিলক্ষিত হয়েছে।
শুধুমাত্র আদালত চত্বর নয়, পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সীমানাপ্রাচীর, পৌর ভবনের দেয়াল, মহাসড়কের সড়কবাতির খুঁটি এবং ট্রাফিক আইল্যান্ডসহ শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সম্ভাব্য প্রার্থী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শত শত সাইনবোর্ড ও বিলবোর্ড দেখা গেছে। শহরের কাউন্সিলপাড়া এলাকার বাসিন্দা তারিকুল ইসলাম বলেন, "গাছে পেরেক মেরে ও যেখানে-সেখানে সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে। এতে শহরের সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে, অনেক জায়গায় চলাচলেও সমস্যা হচ্ছে।"
গত বুধবার ও বৃহস্পতিবার পারনান্দুয়ালী বাস টার্মিনাল থেকে পুলিশ লাইনস, ভায়না মোড় থেকে নোমানী ময়দান এবং ঢাকা রোড থেকে নতুন বাজার পর্যন্ত তিনটি সড়কে সরেজমিনে প্রায় ৪৫০টি ছোট-বড় সাইনবোর্ড ও বিলবোর্ড পাওয়া গেছে। এর বেশির ভাগই সম্ভাব্য পৌর ও উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের প্রার্থীদের প্রচারণামূলক।
পৌর ভবনের তথ্য বোর্ডের নির্ধারিত স্থানটি ব্যানারে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। চৌরঙ্গী মোড়, সড়কবাতির খুঁটি ও বিভিন্ন সরকারি স্থাপনাতেও একই চিত্র। বিশেষ করে চৌরঙ্গী মোড় এলাকায় একই স্থানে ১৭টি বিভিন্ন আকারের সাইনবোর্ড চোখে পড়ে। সম্প্রতি ওই এলাকায় জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান প্রার্থী মো. আজমত হোসাইনের দুটি বিলবোর্ড খুলে নেওয়ার অভিযোগে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। এ বিষয়ে মো. আজমত হোসাইন বলেন, "রাজনীতিতে প্রতিযোগিতা থাকবে। তাই বলে বিলবোর্ড সরিয়ে নেওয়া অন্যায়।"
শহরে যাঁদের সাইনবোর্ড দেখা গেছে, তাঁদের মধ্যে জেলা বিএনপির সদস্য কুতুব উদ্দিন, মিজানুর রহমান, যুগ্ম আহ্বায়ক আলমগীর হোসেন, খান হাসান ইমাম, পৌর বিএনপির সভাপতি মাসুদ হাসান খান, যুবদল সভাপতি ওয়াসিকুর রহমান এবং জামায়াতের নেতা মাসুদুল আলম ও মো. আজমত হোসাইন উল্লেখযোগ্য।
এই পরিস্থিতি নিয়ে মাগুরা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আলী আহম্মেদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘সক্রিয় কিছু নেতার পাশাপাশি বিএনপির রাজনীতিতে এত দিনে যাঁদের কোনো ভূমিকা নেই, এমন কিছু ব্যক্তিও দেখলাম ব্যানার টানাইছে। এগুলো দৃষ্টিকটু। শহরকে অপরিচ্ছন্ন করে দিচ্ছে। অনেক জায়গায় ট্রাফিক ব্যবস্থায় সমস্যা তৈরি করছে এবং চালকদের চলাচলে অসুবিধা হচ্ছে। এটা আমাদের জন্য বিব্রতকর। এ বিষয়ে দলের উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে কথা বলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
পৌরসভার তথ্য বোর্ড ও সীমানাপ্রাচীরে ব্যানার টানানোর বিষয়ে মাগুরা পৌরসভার প্রশাসক ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আবদুল কাদের জানান, বিষয়টি তাঁর নজরে এসেছে এবং যাঁরা ব্যানার টানিয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে কথা বলে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেলা প্রশাসক মোতাকাব্বীর আহমেদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে প্রচার চালানোর কোনো সুযোগ নেই। প্রথমে এ বিষয়ে একটি নোটিশ জারি হবে। যাঁরা নিজেরা সরিয়ে নেবেন না, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
দেয়াললিখন ও পোস্টার লাগানো (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১২ অনুযায়ী নির্ধারিত স্থান বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি ছাড়া যত্রতত্র দেয়াললিখন বা পোস্টার লাগানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং এটি একটি দণ্ডনীয় অপরাধ।
তবে বর্তমানে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা না হওয়ায় ব্যানার বা ফেস্টুন টানানোর ক্ষেত্রে আইনগত কোনো বাধা দেখছেন না জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির সাঈদ আহমদ। তিনি বলেন, "এখন যে প্রচারণা চলছে, তা চলতে পারে। তবে তফসিল ঘোষণার পর যখন আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি হবে, তখন সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এ ছাড়া যদি প্রশাসনের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা আসে যে কোথায় ব্যানার লাগানো যাবে বা যাবে না, তবে অবশ্যই সেই আইন ও নির্দেশনা মেনে চলবেন।"
তফসিল ঘোষণার আগেই নির্বাচনী প্রচারের বিষয়ে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ফারাজী বেনজীর আহম্মেদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "নির্বাচন কমিশনের আচরণবিধি তফসিল ঘোষণার পর কার্যকর হয়। এর আগে ব্যানার-পোস্টার নিয়ন্ত্রণে কমিশনের সরাসরি কোনো ভূমিকা নেই। তফসিলের আগে এ ধরনের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের নয়; বরং পৌরসভা, সিটি করপোরেশন বা সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আইনের আওতায় পড়ে।"