গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তাঁর পদত্যাগের কারণ হিসেবে ‘অটোনমিক নিউরোপ্যাথি’ নামক একটি রোগের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, এই রোগের প্রভাবে তিনি প্রায়ই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। তাঁর এই অসুস্থতার কথা সামনে আসায় সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জেগেছে, এই রোগটি আসলে কী এবং এর প্রভাব কেমন।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, অটোনমিক নিউরোপ্যাথি হলো স্নায়ুতন্ত্রের একটি জটিল রোগ। মানবদেহে অটোনমিক নার্ভাস সিস্টেম নামক একটি স্নায়ুজাল থাকে। সাধারণ পেরিফেরাল নার্ভ যেমন হাত, পা বা ত্বকের সংবেদন মস্তিষ্কে পৌঁছে দেয়, অটোনমিক নার্ভ তেমন শরীরের অভ্যন্তরীণ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের নিয়ন্ত্রণ পরিচালনা করে। এর মধ্যে রয়েছে পাকস্থলী, অন্ত্র, ফুসফুস, হৃদযন্ত্র, কিডনি, মূত্রথলি, জননেন্দ্রিয় এবং রক্তনালী।

এই স্নায়ুগুলো বিভিন্ন কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যার মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ডায়াবেটিস অন্যতম প্রধান কারণ। সাবেক রাষ্ট্রপতি দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত বলে জানা গেছে। যদিও তাঁর ক্ষেত্রে ঠিক কোন কারণে এই জটিলতা তৈরি হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত চিকিৎসা-তথ্য প্রকাশ করা হয়নি, তবে দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিস অটোনমিক নিউরোপ্যাথির একটি পরিচিত কারণ।

অটোনমিক নার্ভাস সিস্টেমের দুটি প্রধান অংশ হলো সিমপ্যাথেটিক ও প্যারাসিমপ্যাথেটিক নার্ভ। এই নার্ভগুলো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থেকে তথ্য মস্তিষ্কে পাঠায় এবং মস্তিষ্কের নির্দেশ পুনরায় অঙ্গগুলোর কাছে পৌঁছে দেয়। ফলে এই স্নায়ুগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে শরীরের অভ্যন্তরীণ কার্যকারিতা ব্যাহত হয়। যেমন—

পাকস্থলী ও অন্ত্রের ক্ষেত্রে এই নার্ভগুলো সংকোচন-প্রসারণ এবং পেরিস্টালসিস নিয়ন্ত্রণ করে। এতে সমস্যা হলে পরিপাক প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায়, যার ফলে কোষ্ঠকাঠিন্য, পেট ভরা থাকা এবং রুচি কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। কখনও কখনও কোষ্ঠকাঠিন্যের পর ডায়রিয়া হতে পারে।

মূত্রতন্ত্রের ক্ষেত্রে মূত্রনালী বা ইউরিনারি ব্লাডারের নিয়ন্ত্রণ নষ্ট হতে পারে, যার ফলে প্রস্রাব ধরে রাখতে না পারা বা মূত্রথলিতে প্রস্রাব রয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা তৈরি হয়। এছাড়া পুরুষের ইরেকটাইল ডিসফাংশনের অন্যতম কারণ হিসেবে এই রোগটি চিহ্নিত।

হৃদযন্ত্রের স্বাভাবিক হৃৎস্পন্দনের ওঠানামা এই সিস্টেমের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। এই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললে বিশ্রামের সময় বা ঘুমের মধ্যেও হৃৎস্পন্দন দ্রুত হতে পারে, যাকে বলা হয় রেস্টিং ট্যাকিকারডিয়া।

রক্তনালীর ওপর এই রোগের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। স্বাভাবিক অবস্থায় বসা বা শোয়া থেকে উঠে দাঁড়ালে রক্তচাপ সামান্য কমে যায়, যা অটোনমিক নার্ভ দ্রুত সংকুচিত করে স্বাভাবিক রাখে। কিন্তু নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হলে হঠাৎ উঠে দাঁড়ালে মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়, চোখমুখ অন্ধকার হয়ে আসে এবং ব্যক্তি অচেতন হয়ে পড়তে পারে। একে চিকিৎসা বিজ্ঞানে পোসচুরাল হাইপোটেনশন বলা হয়।

এছাড়া ত্বকের তাপমাত্রা ও ঘাম নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হলে অতিরিক্ত বা কম ঘাম হওয়া, ত্বকের শুষ্কতা এবং গরম-ঠান্ডার অনুভূতিতে বিঘ্ন ঘটতে পারে।

দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস ছাড়াও অ্যামাইলোডোসিস, গুলেন-ব্যারি সিনড্রোমের মতো স্নায়ুজনিত রোগ, নির্দিষ্ট কিছু সংক্রমণ, অটোইমিউন রোগ এবং কেমোথেরাপির প্রভাবে অটোনমিক নিউরোপ্যাথি হতে পারে।

এই রোগের অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোনো স্থায়ী সমাধান নেই, তবে জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং ওষুধের মাধ্যমে উপসর্গগুলো নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। যেমন— ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা, বসা বা শোয়া থেকে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ানো, ওঠার সময় লাঠি বা সহায়ক উপকরণ ব্যবহার, রাতে ঘুমানোর সময় পায়ে স্টকিং পরা, মূত্রথলির সমস্যার জন্য সেলফ-ক্যাথেটারাইজেশন বা ওষুধ ব্যবহার, অন্ত্রের পরিচলন বাড়াতে চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ সেবন এবং ভারসাম্য বজায় রাখতে বিশেষ ব্যায়াম করা।