বর্তমান সরকার প্রতিশোধের সংস্কৃতি পরিহার করে ন্যায়বিচারের একটি নতুন সংস্কৃতি গড়ে তুলতে আগ্রহী, যেখানে অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত হবে এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলো যথাযথ বিচার পাবে। শুক্রবার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ঢাকা ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিটিকস (দায়রা) আয়োজিত ‘অ্যাটরোসিটি রিস্ক অ্যান্ড প্রিভেনশন’ (নৃশংসতার ঝুঁকি ও তা প্রতিরোধ) শীর্ষক এক প্যানেল আলোচনায় এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।

মাহদী আমিন বলেন, "গত ১৬ বছরের শাসনামলে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, হেফাজতে মৃত্যু এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলার প্রধান ভুক্তভোগী ছিলবিএনপিসহ গণতন্ত্রপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা–কর্মীরা। বিএনপি দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হওয়ায় নির্যাতনের মাত্রাও তাদের ক্ষেত্রে বেশি ছিল। তবে নির্যাতন কেবল একটি দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। সরকারের সমালোচনা করেছেন বা হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়েছেন—এমন বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীও একই ধরনের নিপীড়নের শিকার হয়েছেন।"

গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা কিংবা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনাগুলোকে কেবল পরিসংখ্যান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে উল্লেখ করেন তিনি। মাহদী আমিন বলেন, "এসব ঘটনার প্রতিটি একটি পরিবারকে স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। অনেক মানুষ আর ফিরে আসেননি। আবার কেউ কেউ দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকার পর ফিরে এলেও তাঁদের পরিবারকে চরম অনিশ্চয়তা ও দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।"

রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাঠামোকে জনগণের অধিকার ও স্বাধীনতা রক্ষার লক্ষ্যে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান সরকার। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করাই সরকারের লক্ষ্য বলে জানান তিনি। মাহদী আমিনের দাবি, সরকারের প্রথম পাঁচ মাসে রাজনৈতিক কারণে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা বা হেফাজতে মৃত্যুর কোনো ঘটনা ঘটেনি।

প্রতিশোধের রাজনীতিতে আগ্রহী নয় সরকার উল্লেখ করে তিনি বলেন, "সরকার অতীতে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর সঙ্গে জড়িত নির্দেশদাতা ও বাস্তবায়নকারীদের আইনের আওতায় এনে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে চায়। একই সঙ্গে নিরপরাধ মানুষ যেন কোনো ধরনের হয়রানি বা প্রতিহিংসার শিকার না হন, সে বিষয়েও সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।"

সরকারের লক্ষ্য এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে সব মত ও পথের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত হবে বলে তিনি জানান।

অনুষ্ঠানে অস্ট্রেলিয়া দূতাবাসের ডেপুটি হেড অব মিশন এবং ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার ক্লিনটন পব জানান, সম্প্রতি গুমবিষয়ক প্রস্তাবিত আইনের খসড়ায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের অনেক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা একটি ইতিবাচক অগ্রগতি। তিনি বলেন, “আমি মনে করি, সেই সময়ে যখন আমি এটি নিয়ে কাজ করছিলাম, তখন আইনটি বাস্তবে কীভাবে কাজ করবে তা নিয়ে আমার কিছু প্রশ্ন ছিল—বিশেষ করে যখন অভিযোগটি নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে হয়, তখন মানবাধিকার কমিশন এবং নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে তদন্তের কাজটি কীভাবে ভাগ করা হবে? এগুলো কঠিন প্রশ্ন। কিন্তু সেই কাজ চলমান রয়েছে এবং আমি আত্মবিশ্বাসী যে সরকার একটি কার্যকর সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে।”

ইউনিভার্সিটি অব হংকংয়ের আইন অনুষদের গ্লোবাল একাডেমিক ফেলো সিনথিয়া ফরিদ বলেন, গণতান্ত্রিক শাসনের দিকে পেন্ডুলাম কতটা ঝুঁকবে, তা নির্ভর করে সিস্টেমের ভেতরে গড়ে ওঠা প্রতিরোধের ওপর। এই প্রক্রিয়ায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মুক্ত গণমাধ্যম এবং কার্যকর সংসদের গুরুত্ব অপরিসীম বলে মনে করেন তিনি।

আলোচনায় নেত্র নিউজের বিশেষ প্রতিনিধি আকিব মো. শাতিল উল্লেখ করেন, ২০১০ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের পর নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর মধ্যে ধারাবাহিক সামরিকীকরণ লক্ষ্য করা গেছে। নেত্র নিউজের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জুলাই অভ্যুত্থানের সময় পুলিশ টাইপ-৫৬ রাইফেলের মতো সামরিক গ্রেডের অস্ত্র এবং সেমি-অটোমেটিক ও অটোমেটিক রাইফেল ব্যবহার করেছে।

ওয়েস্টার্ন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাডজাঙ্কট রিসার্চ ফেলো মোবাশ্বের হাসান প্যানেল আলোচনাটি পরিচালনা করেন।